Thursday, January 30, 2014

কনসেপচুয়াল ফটোগ্রাফি ও ধ্রুব এষ

কনসেপচুয়াল ফটোগ্রাফিতে এই ভাবনা ও পরিকল্পনাই প্রধান। আলোকচিত্রী একটি কনসেপচুয়াল ফটোগ্রাফের মাধ্যমে কি প্রকাশ করতে চান সে অনুযায়ী পুরো কর্মযজ্ঞটিকে বাস্তবায়ন করতে হয়। এই ধরনের ফটোগ্রাফির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য- একজনের ছবির সাথে অন্য কারো ছবির মিল থাকে না। সবচেয়ে ব্যতিক্রম ও উন্নত ভাবনাই একটি ছবিকে আরেকটি ছবি থেকে ভিন্ন ও বৈশিষ্ট্যপূর্ণ করে তোলে


সুদীপ্ত সালাম

নিজস্ব অভিনব, অর্থবোধক ও শৈল্পিক চিন্তা থেকে ছবি তৈরি করাকে কনসেপচুয়াল ফটোগ্রাফি বলে। প্রাকৃতিক দৃশ্যের মতো কনসেপচুয়াল ফটোগ্রাফির সাবজেক্ট তৈরি থাকে না, তৈরি করে নিতে হয়। সেটা ঘরের ভেতরে হতে পারে, ঘরের বাইরেও করা যায়। আবার এমন হয়, আগে থেকেই তৈরি কোনো বিষয়ের সাথে নিজের ভাবনাজাত সাবজেক্ট বা অবজেক্ট যোগ করেও কনসেপচুয়াল ফটোগ্রাফি করা হয়ে থাকে। যেমন- আকাশ (আগে থেকে তৈরি থাকা), আকাশের দিকে উত্থিত একটি হাত (ভাবনাজাত)। আরো উচ্চমানের কনসেপচুয়াল ফটোগ্রাফ তৈরি করতে বর্তমানে বেশিরভাগ ফটো এডিটিং সফ্ট্ওয়্যারের সহযোগিতা নেয়া হয়। প্রথমে একটি ভাবনা ও পরিকল্পনা তৈরি করতে হয়। কনসেপচুয়াল ফটোগ্রাফিতে এই ভাবনা ও পরিকল্পনাই প্রধান। আলোকচিত্রী একটি কনসেপচুয়াল ফটোগ্রাফের মাধ্যমে কি প্রকাশ করতে চান সে অনুযায়ী পুরো কর্মযজ্ঞটিকে বাস্তবায়ন করতে হয়। এই ধরনের ফটোগ্রাফির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য- একজনের ছবির সাথে অন্য কারো ছবির মিল থাকে না। সবচেয়ে ব্যতিক্রম ও উন্নত ভাবনাই একটি ছবিকে আরেকটি ছবি থেকে ভিন্ন ও বৈশিষ্ট্যপূর্ণ করে তোলে।
বাংলাদেশে মূলধারার ফটোগ্রাফি যেখানে অবহেলিত সেখানে কনসেপচুয়াল ফটোগ্রাফিকে বিলাসিতা মনে হওয়া অস্বাভাবিক নয়। ফটোগ্রাফিকে যেখানে শিল্পকলা হিসেবে মেনে নিতে দ্বিধা, সেখানে কনসেপচুয়াল ফটোগ্রাফি আলোচনার বাইরে থেকে যায়। আমাদের দেশেও তেমনটিই ঘটেছে। সেহেতু বাংলাদেশে  ফটোগ্রাফির এধারাটি প্রায় গুরুত্বহীন। তাই বলে যে কেউ কনসেপচুয়াল ফটোগ্রাফি করছে না তা নয়। কিন্তু যে মানুষটির একক প্রচেষ্টায় বাংলাদেশে কনসেপচুয়াল ফটোগ্রাফি নীরব জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে তিনি হলেন ধ্রুব এষ। তিনি একাধারে চিত্রশিল্পী, প্রচ্ছদশিল্পী ও লেখক। আমরা জানি সবশেষে তিনি একজন চিত্রশিল্পীই। প্রায় দুই যুগ ধরে তিনি প্রচ্ছদ করছেন এবং এপর্যন্ত ১০ হাজারেরও বেশি প্রচ্ছদ করেছেন। তার জনপ্রিয়তা ঈর্ষণীয়। তিনি হয়তো নিজেও জানেন না তিনি বাংলাদেশের কনসেপচুয়াল ফটোগ্রাফিতে কি অসামান্য ভূমিকা রেখে চলেছেন। আমরা তার করা অসাধরণ সব প্রচ্ছদ দেখছি, প্রশংসা করছি। কিন্তু বেশিরভাগ মানুষই জানে না সে প্রচ্ছদগুলোর একাংশ কনসেপচুয়াল ফটোগ্রাফির পর্যায়ে পড়ে। তার করা প্রচ্ছদের কমপক্ষে এক তৃতীয়াংশ কনসেপচুয়াল ফটোগ্রাফি। এই কথার অর্থ এই নয় যে ধ্রুব এষ একজন আলোকচিত্রশিল্পী। তার প্রচ্ছদে ব্যবহৃত ফটোগ্রাফগুলোও হয়তো তার তোলা নয়। কিন্তু আগেই বলেছি কনসেপচুয়াল ফটোগ্রাফিতে ভাবনা ও পরিকল্পনাই প্রধান। একজন চলচ্চিত্র নির্দেশক একই সাথে একজন চিত্রগ্রাহক নাও হতে পারেন। এই মুহূর্তে মনে পড়ছে হুমায়ূন আহমেদের অরণ্য বইটির কথা। বইয়ের প্রচ্ছদ করেছেন ধ্রুব এষ। তিনি প্রচ্ছদে একটি গাছের ইমেজ রেখেছেন। তিনি গাছটি আঁকেননি, ছোট ছোট শুকনো ডালের টুকরো দিয়ে গাছটি তৈরি করেছেন। আরো মনে পড়ছে ইমতিয়ার শামীমের লেখা ‘আমরা হেঁটেছি যারা’ উপন্যাসের প্রচ্ছদের কথা। সেখানে অযত্নে ছেঁড়া কাগজের ফালি দিয়ে মা ও সন্তানের ফিগার ছুটিয়ে তোলা হয়েছে। মোটা কাগজ ছেঁড়ার পর সৃষ্ট অমসৃণ প্রান্তগুলোই হয়েছে আউটলাইন। বাড়তি কোনো রঙ কিংবা কলমের একটিও আঁচড়ের প্রয়োজন হয়নি। শুধু পুরো ইমেজটির একটি ছবি তুলতে হয়েছে। আরো উল্লেখ করা যায়, হুমায়ূন আহমেদের ‘মৃন্ময়ী’ বইয়ের প্রচ্ছদের কথা। সেখানে দেখি একটি নীল কাপড়ের পর্দা। পর্দার ওপাশে দাঁড়িয়ে আছে নীল শাড়িপরা একজন নারী। পর্দার নিচে তার শাড়ির পাড় দেখা যাচ্ছে। সেই একই ব্যাপার- নেই কোনো বাড়তি আয়োজন, শুধুই একটি কনসেপচুয়াল ফটোগ্রাফ। মুহম্মদ জাফর ইকবালের ‘কাজলের দিনরাত্রি’ বইটির প্রচ্ছদে দেখি, ছোট ছোট রঙিন গোলাকার প্লাস্টিকের টুকরো দিয়ে তৈরি করা হয়েছে কিশোরের মুখ। মঈনুল আহসান সাবেরের ‘এই দেখা যায় বাংলাদেশ’ বইটির প্রচ্ছদও বিশিষ্ট। প্রচ্ছদে রয়েছে মানুষের হাত। দুহাতের মাঝখানে সাদা কাগজের তৈরি বায়োস্কোপের গোলাকার মুখ। মোটকথা- একটি পরিপূর্ণ কনসেপচুয়াল ফটোগ্রাফ। ম্যাগাজিন ও বিভিন্ন রচনার অলংকরণেও রয়েছে ধ্রুব এষের কনসেপচুয়াল ভাবনা। তার অলংকরণে ছোটদের একটি ছোট্ট বইয়ের কথা প্রাসঙ্গিক (নাম মনে নেই)। বইটির জন্য শুধুমাত্র রঙিন বেলুন পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে বিভিন্ন প্রাণীর ফিগার তৈরি করা হয়েছিল। সেগুলোর ছবিকেই করা হলো আকর্ষণীয় অলংকরণ। আরো মনে পড়ছে, কিছু দিন আগে বেরিয়েছিল সাপ্তাহিক ২০০০-এর ছোটদের ঈদসংখ্যা। ওই ঈদসংখ্যার প্রচ্ছদে ধ্রুব এষ আবারো ব্যবহার করলেন একটি কনসেপচুয়াল ফটোগ্রাফ। ফটোগ্রাফের সাবজেক্ট-  কাগজের তৈরি কিছু পাখি। এমন আরো অসংখ্য প্রচ্ছদের কথা বলা যায়। বাংলাদেশে কনসেপচুয়াল ফটোগ্রাফি তার হাত ধরে প্রচ্ছদ আকারে জনপ্রিয় হয়েছে। তিনি তখন থেকে সচেতন কিংবা অসচেতনভাবে কনসেপচুয়াল ফটোগ্রাফি নিয়ে কাজ শুরু করেছেন যখন বাংলাদেশে কনসেপচুয়াল ফটোগ্রাফির কনসেপ্টই প্রচলিত ছিল না। সেদিক থেকে তাকে বাংলাদেশের কনসেপচুয়াল ফটোগ্রাফির অন্যতম প্রধান পথিকৃৎ বলাই যায়।    

-''সাপ্তাহিক ২০০০'' (১২ এপ্রিল ২০১৩) পত্রিকার নববর্ষ সংখ্যা ১৪২০-এ প্রকাশিত     

1 comment:

  1. ভাই ভালো লিখেন আপনি । শুভকামনা

    ReplyDelete