সম্প্রতি বেশ কয়েকজন আলোকচিত্রীর নাম বারবার শোনা যাচ্ছে। তাদের বেশিরভাগই তরুণ। অনেকের বয়স তিরিশেরও কম। কিন্তু এরাই গোটা বিশ্বআলোকচিত্রকলা জগৎকে আন্দোলিত করেছেন, করছেন। তারা তাদের আঞ্চলিক সীমানা ডিঙিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করেছেন। এদের কয়েকজন আবার এই প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পা রেখেছেন এদের কয়েকজন আবার এই প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পা রেখেছেন। এই শিল্পীরা তাদের শক্তিশালী ও অনন্যসাধারণ ছবির মাধ্যমে নিজের সৃজনশীলতাকে যেমন বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেছেন একই সাথে বিশ্ববিবেককেও নাড়া দিয়েছেন। ছবিগুলো দেখে আমরা নাড়া খাই, শোকাহত হই, আনন্দিত হই এবং বিস্মিত হই। এই সময়ে আলোচনার কেন্দ্রে থাকা কয়েকজন আলোকচিত্রী এবং তাদের কাজ নিয়েই এই নিবন্ধ
![]() |
| 'ওয়ার্ল্ড প্রেস ফটো অব দ্য ইয়ার ২০১৩' বিজয়ী ছবি |
সম্প্রতি বেশ কয়েকজন আলোকচিত্রীর নাম বারবার
শোনা যাচ্ছে। তাদের বেশিরভাগই তরুণ। অনেকের বয়স তিরিশেরও কম। কিন্তু এরাই
গোটা বিশ্বআলোকচিত্রকলা জগৎকে আন্দোলিত করেছেন, করছেন। তারা তাদের আঞ্চলিক
সীমানা ডিঙিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করেছেন। এদের কয়েকজন
আবার এই প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পা রেখেছেন এদের কয়েকজন
আবার এই প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পা রেখেছেন। এই শিল্পীরা তাদের
শক্তিশালী ও অনন্যসাধারণ ছবির মাধ্যমে নিজের সৃজনশীলতাকে যেমন বিশ্ববাসীর
সামনে তুলে ধরেছেন একই সাথে বিশ্ববিবেককেও নাড়া দিয়েছেন। ছবিগুলো দেখে আমরা
নাড়া খাই, শোকাহত হই, আনন্দিত হই এবং বিস্মিত হই। এই সময়ে আলোচনার
কেন্দ্রে থাকা কয়েকজন আলোকচিত্রী এবং তাদের কাজ নিয়েই এই নিবন্ধ।
এবছর ‘ব্রেকিং নিউজ ফটোগ্রাফি’ বিভাগে পুলিৎজার পুরস্কার পেয়েছে
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের ৫ জনের একটি দল। ফটোসাংবাদিক রোডরিগো অ্যাব্ড
অন্যতম। অ্যাবডের জন্ম ১৯৭৬ সালে, আর্জেন্টিনায়। সিরিয়ার অব্যাহত
গৃহযুদ্ধের ছবিগুলোর জন্য তিনি এই পুরস্কার অর্জন করেন। সিরীয় গৃহযুদ্ধের
ভয়াবহতা, বিশেষ করে আসাদ-সরকার অনুগত বাহিনীর নির্মমতা ছবিগুলোর প্রধান
সুর। গত বছর সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের একটি ছবির জন্যই অ্যাব্ড ‘ওয়ার্ল্ড প্রেস
ফটো’ পুরস্কার অর্জন করেছেন।
ম্যানু ব্রাবো অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের
ফটোসাংবাদিক। তিনিও সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের ওপর কাজ করে এবছর পুলিৎজার পুরস্কার
(‘ব্রেকিং নিউজ ফটোগ্রাফি’ বিভাগ) পেয়েছেন। ব্রাবো স্পেনে ১৯৮১ সালে
জন্মগ্রহণ করেন। রক্তক্ষয়ী সিরিয়া যুদ্ধের বেদনা, বর্বরতা, অমানবিকতার ছাপ
তার প্রতিটি ছবিতে বিদ্যমান। ছবি তোলার ক্ষেত্রে ব্রাবো অনুসন্ধানী এবং
দুঃসাহসিক।![]() |
| জাভিয়ার মানজানোর পুলিৎজার বিজয়ী ছবি |
ফিলিস্তিনী-মিসরীয় আলোকচিত্রী খলিল হামরার জন্ম (১৯৭৯) কুয়েতে। তিনিও এবছর ‘ব্রেকিং নিউজ ফটোগ্রাফি’ বিভাগে পুলিৎজার পুরস্কার অর্জন করেছেন। বলাবাহুল্য, তিনিও অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের ফটোসাংবাদিক হিসেবে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের ওপর কাজ করেছেন। সেই ছবিগুলোর জন্যই পেলেন পুলিৎজার। সামাজিক ও রাজনৈতিক সঙ্কটে তিনি ক্যামেরা হাতে ঝাঁপিয়ে পড়তে দেরি করেন না। এজন্য বহুবার তাকে আহতও হতে হয়েছে। সিরিয়া যুদ্ধের ভয়ঙ্কর দানবিক রূপ তার ছবিগুলোতে ধরা পড়েছে। পাশাপাশি যুদ্ধের ভেতর দিয়ে বেড়ে ওঠা শিশুদের আলোমাখা মুখগুলো ইতিবাচক ইঙ্গিত বহন করে।
২০১৩ সালে ‘ব্রেকিং নিউজ ফটোগ্রাফি’ বিভাগে পুলিৎজার পুরস্কারপ্রাপ্ত ৫ জন অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস আলোকচিত্রীর একজন মুহাম্মদ মুহাইসিন। মুহাইসিন মধ্যপ্রাচ্যের যেকোনো রাজনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় বিপর্যয়ে হাজির। তিনিও সিরিয়া যুদ্ধের ছবিগুলোর জন্য পুলিৎজার পেলেন। সিরিয়া গৃহযুদ্ধের নির্মম বাস্তবতা সম্বলিত তার এক একটি ছবি এক একটি ঐতিহাসিক দলিল। জেরুজালেমে ১৯৮১ সালে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। ইরাক যুদ্ধের ওপর কাজ করে একই বিভাগে ২০০৫ সালেও তিনি পুলিৎজার অর্জন করেছিলেন।
![]() |
| মিশেল পালাজ্জির 'গন উইথ ডাস্ট#২' |
ইতালীয় আলোকচিত্রী মিশেল পালাজ্জি তার ‘গন উইদ দ্য ডাস্ট#২’ শিরোনামের ছবির জন্য ব্রিটেনের ‘চার্টার্ড ইনস্টিটিউশন অব ওয়াটার অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট ম্যানেজমেন্ট’-এর দেয়া বর্ষসেরা পরিবেশবাদী আলোকচিত্রী পুরস্কার ২০১৩ অর্জন করেছেন। ধুধু মরুভূমিতে ধূলিঝড়, ফ্রেমের মাঝখানে দুটি শিশু। তারা হয়তো খেলতে বেরিয়েছিল, কিন্ত ধূলিঝড় সব পণ্ড করে দেয়। বিশাল ক্যানভাস পরিবেশের রূঢ়তার ব্যাপ্তিকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। দিগন্তজোড়া মরা ঘাসে ছাওয়া মরুভূমি এবং অর্ধেক ফ্রেমজুড়ে থাকা পাংশুটে আকাশ অশনি সংকেত দেয়। প্রায় ৬ লাখ টাকা মূল্যের পুরস্কারজয়ী এই ছবিটি মঙ্গোলিয়ার গোবি মরুভূমি থেকে তোলা হয়েছিল। মিশেল ১৯৮৪ সালে রোমে জন্মগ্রহণ করেন।
‘ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক আলোকচিত্র প্রতিযোগিতা ২০১২’র গ্র্যান্ড প্রাইজ অর্জন করেছেন ব্রিটিশ আলোকচিত্রী আশলি ভিনসেন্ট। তিনি তার ‘দ্য এক্সপ্লোশন!’ শিরোনামের ছবিটির জন্য এই সম্মাননা পেয়েছেন। এটি থাইল্যান্ডের একটি চিড়িয়াখানা থেকে তোলা বুসাবা নামের বাঘিনীর পোরট্রেট। বাঘিনীটি গোসলের পর শরীর ঝারছে। সেই মুহূর্তটিকে হাই শাটার স্পিডের মাধ্যমে সফলভাবে ফ্রিজ করতে সক্ষম হয়েছেন পরিশ্রমী আলোচিত্রী। টেলি লেন্স হওয়ায় একটি ঝঞ্ঝাটমুক্ত ব্লার ব্যাকগ্রাউন্ডও পাওয়া গেছে।
বিশ্বের সবচেয়ে প্রচীন ফটোগ্রাফিবিষয়ক পত্রিকা ‘দ্য ব্রিটিশ জার্নাল অব ফটোগ্রাফি’ প্রণীত ‘আন্তর্জাতিক ফটোগ্রাফি অ্যাওয়ার্ড’ (২০১২) অর্জন করেছেন আলভারো ডেপ্রাইট। স্পেনিশ আলোকচিত্রী ডিপ্রাইট তার ‘সাসপেনশন’ শিরোনামের একগুচ্ছ ছবির জন্য সিরিজ ক্যাটাগরিতে এ পুরস্কার অর্জন করেছেন। সিরিজটিতে উঠে এসেছে নতুন জীবনের খোঁজে ইতালিতে পাড়ি জমানো কিছু মানুষের গল্প। তাদের স্বপ্ন ও বেদনা ছবিগুলোতে ফুটে উঠেছে। আলোকচিত্রের মাধ্যমেও যে মানুষের মনোজগৎটা মেলে ধরা সম্ভব ডিপ্রাইটের ‘সাসপেনশন’ তার প্রমাণ। ছবিতে আলো-ছায়ার খেলা দেখাতেও ডিপ্রাইটের জুড়ি নেই। তার জন্ম ১৯৭৭ সালে।
সিঙ্গেল ইমেজ ক্যাটাগরিতে ‘দ্য ব্রিটিশ জার্নাল অব ফটোগ্রাফি’র ‘আন্তর্জাতিক ফটোগ্রাফি অ্যাওয়ার্ড’ (২০১২) অর্জন করেছেন মস্কোর নিকোলাই ইশশুক। ইশশুকের জন্ম ১৯৮২ সালে। তিনি তার তোলা একটি ফ্যামিলি পোরট্রেটের জন্য এই পুরস্কার পান। ক্যামেরাবন্দি করার সময় এটি ছিল একটি সাদা-মাটা ছবি; এক দম্পতি একে অন্যকে চুমু দিচ্ছেন, ব্যাকগ্রাউন্ডে নৈসর্গিক দৃশ্য। কিন্তু ইশশুক ফটোশপের ‘অফসেট’ কমান্ড ব্যবহার করে ফ্রেমের দুপাশে দুজনকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন। ব্যাকগ্রাউন্ড পরিবর্তন করেননি। এ যেন প্রকৃতিকে সাক্ষী রেখে ভালোবাসার অস্তিত্ব দৃঢ় করার প্রয়াস।
![]() |
| ওসামা আল জুবাইদির মরুভূমি |
সংযুক্ত আরব আমিরাতের ‘হামদান আন্তর্জাতিক ফটোগ্রাফি অ্যাওয়ার্ড (এইচআইপিএ) ২০১৩‘র ১ লাখ মার্কিন ডলার মূল্যের গ্র্যান্ড প্রাইজ অর্জন করেছেন ওসামা আল জুবাইদি। ‘বিউটি অব লাইট’ ক্যাটাগরিতে তিনি এই পুরস্কার জয় করেন। আবু ধাবি নিবাসী এই আলোকচিত্রী মরুভূমির ছবির জন্য এই পুরস্কার অর্জন করেন। রুক্ষ মরুভূমিরও যে প্রাণ আছে, রূপ আছে, লাবণ্য আছে, একটি অনবদ্য শরীর আছে, সে শরীরে যে ঢেউও আছে তা এই ছবিটি দেখলে বুঝা যায়। আলোকচিত্রী এই ছবিটি তুলতে একটি বিশেষ সময়কে বেছে নিয়েছেন, ফলে লাল বালি সোনা বলে ভ্রম হয়। মরুর বিশাল শরীর বুঝাতে এরিয়েল ভিউ নির্বাচন এবং ফ্রেমে সীমিত মানুষ রাখার সিদ্ধান্ত ছবিটিকে করেছে সোনায় সোহাগা।
![]() |
| আন্দ্রিয়া ইয়েস্টভাংয়ের সিরিজ পোরট্রেটের একটি |
এবছর ‘সনি ওয়ার্ল্ড ফটোগ্রাফি অ্যাওয়ার্ডস ফটোগ্রাফার অব দ্য ইয়ার’ পুরস্কার অর্জন করেছেন নরওয়ের নারী আলোকচিত্রী আন্দ্রিয়া ইয়েস্টভাং। এই পুরস্কারটি শুধু ‘লিরিস ডোর’ নামেও পরিচিত। ২০১১ সালের জুলাইয়ে অসলোর ইউটোইয়া দ্বীপে সন্ত্রাসী হামলায় প্রাণে বেঁচে যাওয়া ভুক্তভোগীদের ‘ওয়ান ডে ইন হিস্ট্রি’ শিরোনামের সিরিজ পোরট্রেটের জন্য আলোকচিত্রী এ বিরল সম্মাননায় ভূষিত হলেন। আলো-ছায়ার যুগলবন্দি ছবিগুলোকে করেছে অনিন্দ্য। ছবির মানুষগুলোর পঙ্গুত্বকে অকৃত্রিম ও স্বর্গীয় আলো দিয়ে পূর্ণ করার প্রচেষ্টা প্রশংসনীয়। ২৫ হাজার মার্কিন ডলার (প্রায় ৩০ লাখ ২২ হাজার টাকা) মূল্যের এই পুরস্কারটি পেতে মোট ১শ ৭০টি দেশ থেকে প্রায় ১ লাখ ২২ হাজার ছবি জমা পড়েছিল। আন্দ্রিয়ার জন্ম ১৯৮১ সালে।
-সাপ্তাহিক ২০০০ : বর্ষশুরুসংখ্যা ২৪ মে, ২০১৩ [বর্ষ ১৬ সংখ্যা ১





No comments:
Post a Comment