Thursday, December 20, 2018

যাযাবর দৃশ্যাবলি


হলুদে বর্ণের ৯ বাই ১১ ইঞ্চির চ্যাপ্টা বইটি যেদিন হাতে পাই সেদিনই ভেবেছি বইটি নিয়ে লিখবো। হ্যাঁ, বইটির ডানা দুটি না খুলেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। বইয়ের প্রচ্ছদ আমার কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রচ্ছদ ভালো না হলে আমার মন বইটি কিনতে সায় দেয় না। সদ্য প্রকাশিত ‘দেসতেরাদোস’ শিরোনামের ছবির বইটির (ফটোবুক) প্রচ্ছদ দেখেই মাত হয়েছিলাম। প্রচ্ছদের হলুদ জমিনে হালকা সবুজ রঙের প্রিমিটিভ নকশার পুনরাবৃত্তি বইয়ের প্রচ্ছদটিকে করেছে নান্দনিক ও গম্ভীর। প্রিমিটিভ বা ফোক আর্ট কেন ব্যবহার করা হয়েছে তা এই বই-আলোচনা থেকেই আমরা বুঝতে পারবো। স্পেনিশ ‘দেসতেরাদোস’ শব্দের বাংলা ও ইংরেজি অর্থ ‘নির্বাসিত’। ছবির বইটি বাংলাদেশের বিভিন্ন যাযাবর সম্প্রদায়ের মানুষদেরকে নিয়ে। যাযাবরদের কোনো ঠিকানা নেই, স্থায়ী বসতি নেই, শেকড় নেইÑ তারা তো এক অর্থে নির্বাসিতই। বইটি স্পেন থেকে বের হয়েছে। বের করেছে ইনডিটেক্স চেয়ার অব স্প্যানিশ ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যান্ড কালচার। বাংলাদেশ ও স্পেনের মধ্যকার শিা ও সাংস্কৃতিক বিনিময় কর্মসূচির অংশ হিসেবে বইটি বের করা হয়েছে। তাই অমূল্য এই বইটির কোনো দাম রাখা হয়নি। এই বই-প্রকল্পে কাজ করেছেন বাংলাদেশের আলোকচিত্রী সুমন ইউসুফ ও স্পেনের সালভাদর আরেয়ানো। বইটিতে সুমন ইউসুফের ৩০টি এবং সালভাদর আরেয়ানোর অর্ধশত ছবি স্থান পেয়েছে। বইটির একদিক শুরু হয় সুমনের ৩০টি ছবির ঝাঁপি নিয়ে। এই অংশের নাম রাখা হয়েছে ‘নোমাদাস’ (যাযাবর)। অন্যপাশের প্রচ্ছদ খুললে আরেয়ানো তোলা ছবি। এই অংশের উপনাম ‘পেজ দে সোমব্রা’ (ছায়ামাছ)। তিনি এই শিরোনামটি নিয়েছেন বিখ্যাত স্পেনিশ কবি ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকার যাযাবরদের নিয়ে লেখা একটি কবিতা থেকে। 
    
© সুমন ইউসুফ
দুজনেই বাংলাদেশের যাযাবর সম্প্রদায় নিয়ে কাজ করেছেন। কিন্তু একজনের দৃষ্টভঙ্গি অন্যজনের চেয়ে একেবারেই ভিন্ন। সুমন ইউসুফ কাজ করেছেন বিভিন্ন কারণে বাংলাদেশে বেঘর হওয়া মানুষদেরকে নিয়ে। তিনি জামালপুর, টাঙ্গাইল, ফরিদপুর, মানিকগঞ্জসহ বাংলাদেশের বেশকিছু অঞ্চল ঘুরে ছবিগুলো তুলেছেন। তিনি তাঁর ছবির মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছেন ভিটেহীন যাবাবর মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের আনন্দ-বেদনার গল্প। তিনি দরদি ও শিল্পীমন নিয়ে এই মানুষগুলোকে অনুভব করেছেন। তিনি তাঁর বইয়ের ভূমিকায় বলেছেন, তিনি নিজেকেও ভিটেহীন মনে করেন। ভাড়াটিয়াদের জীবন তো তা-ই। তিনি আরো জানিয়েছেন, “আমি যেভাবে দেখি সেভাবেই দেখাতে চাই।” আলোকচিত্রীর এই অনুভূতি হাই-কি টোনের সাদাকালো ছবিগুলোকে করেছে মর্মস্পর্শী। যাযাবরদের দৈনন্দিন জীবন ছাড়াও ছবিগুলো আমাদেরকে দেখায় তাদের বিশ্বাস, তাদের টিকে থাকার লড়াই, তাদের অসহায়ত্ব। আমরা দেখি কীভাবে ফসলি জমিতে গড়ে উঠেছে ইটভাটা, গাছ মরে যাচ্ছে, কাটা পড়ছে, আগ্রাসী নদী প্রসারিত করছে তার বাহু। হাই-কি টোন ছবিগুলোতে মরুভূমি-মরুভূমি আবহ তৈরি করেছে। এই স্টাইল ছবিগুলোর জন্য যথার্থই মনে হয়েছে। বেশিরভাগ ছবির সাবজেক্ট ফ্রেমের সেন্টারে রাখা হয়েছে। মিনিমালিস্টক হওয়ায় শূন্যস্থানের আধিপত্য লক্ষণীয়। ওই স্পেস সবগুলো ছবিকে এক সুতোয় বাঁধে, সামগ্রিক বিষয়ের যে ভয়াবহতা, হতাশা, রুক্ষতা, শেষ হয়ে যাওয়া- তাকেই মূর্ত করে এই স্পেস ও ফ্যাকাসে বর্ণ। ছবির কোনো ক্যাপশন নেই। প্রয়োজন পড়েনি। ছবিগুলোই কথা বলে। এক তরুণী তাঁর ঘনকালো লম্বা চুল আঁচড়াচ্ছে, পেছন দিক থেকে তোলা ছবি। জানার প্রয়োজন অনুভব হয় না, ও মেয়ের নাম কি। এমনকি সে দেখতে কেমন তা নিয়েও আগ্রহ নেই দর্শকের। আমরা মেয়ের চুল দেখি, তৎক্ষণাৎ তার বয়স অনুমান করে নিই, তার মুখও কল্পনা করে নিই। এখানেই আলোকচিত্রকর্মের শক্তি। একটি ঢিবি কেটে সমান করা হচ্ছে তার উপর দাঁড়িয়ে আছে একটি শাখা-প্রশাখাহীন বৃক্ষ-কঙ্কাল, ওদিকে দানবের মতো কাজ করে যাচ্ছে বুলডোজার। বলে দিতে হয় না, এসব জমি চলে গেছে ‘বাবু’দের হাতে। স্টিললাইফগুলোও কথা বলে। মানুষগুলোর অসহায়ত্বকে রূপায়িত করেছে তল্পিতল্পা, মোটরযানের কঙ্কাল, বিরানভূমিতে পড়ে থাকা নৌকার ছবি।

© সালভাদর আরেয়ানো
সালভাদর আরেয়ানোর ছবিগুলো বাংলাদেশের বেদে সম্প্রদায়কেন্দ্রিক। বাংলাপিডিয়া জানাচ্ছে,  বেদে একটি ভ্রাম্যমাণ জনগোষ্ঠী। বাংলাপিডিয়া আরো বলছে, কথিত আছে যে, ১৬৩৮ খ্রিস্টাব্দে শরণার্থী আরাকানরাজ বল্লাল রাজার সাথে এরা প্রথমে বিক্রমপুরে (মুন্সিগঞ্জ) বসবাস শুরু করে এবং পরে সেখান থেকে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। বেদের আদি নাম মনতং। বেদে নামটি বাইদ্যা (হাতুড়ে ডাক্তার), ‘বৈদ্য’ (চিকিৎসক) থেকে উদ্ভূত বলে অনেকে মনে করেন। আবার অনেক গবেষকের দাবি, শব্দটি আরবের ‘বেদুইন’ শব্দ থেকে এসেছে। বাংলাপিডিয়ার দাবি, বেদেরা নিজেদের মনতং বলে পরিচয় দিতে বেশি আগ্রহী। বেদেরা দেখতে বাঙালিদের মতোই। আরাকানের রোহিঙ্গাদের গায়ের রং ও আকারও বাঙালিদের মতো। তাই বেদেদের সঙ্গে রোহিঙ্গাদের কোনো সম্পর্ক রয়েছে কিনা- এমন নৃতাত্ত্বিক প্রশ্ন করাই যায়। যাইহোক। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা বিলুপ্তপ্রায় বেদেদের জীবন ও সংগ্রামকে মিডিয়াম ফরম্যাটের ক্যামেরায় চিত্রায়ন করেছেন আরেয়ানো। তিনি তাঁর বাংলাদেশ ভ্রমণে কয়েক ধরণের বেদের মুখোমুখি হয়েছেন, একধরণের বেদে, যাদের নৌকাতেই বসবাস এবং মাছই যাদের জীবন ধারণের অবলম্বন। আরেক ধরণের বেদে রয়েছে, যারা পথের ধারে অস্থায়ী খুপরি তৈরি করে টিকে থাকছে। বিভিন্ন টোটকা ওষুধ ও চিকিৎসা দিয়ে কিংবা সাপ ও বানরের খেলা দেখিয়ে তারা জীবিকা নির্বাহ করে। আরেক দল আছে যারা অনেক চেষ্টায় পায়ের নিচে এক টুকরো স্থায়ী মাটি যোগাড় করার পথে রয়েছে। আরেয়ানো ঠিকই বলেছেন, নদী ভাঙনের কারণে অনেক বেদে যাযাবর শিবিরে যোগ হচ্ছে। তিনি তাঁর বইয়ের ভূমিকায় আরো বলেছেন, শত শত বছর ধরে বাংলাদেশের এই বেদেরা অবহেলিত- এমনকি প্রত্যাখ্যাত। তিনি স্বীকার করেছেন, তাঁর ছবি বেদেদের স্বীকৃতির বিষয়টি সমাধান করার জন্য নয়। শরীফুল, রাসেল, শেফারিদের (শেফালি?) মতো সংগ্রামী বেদেদের জীবনে আলোকপাত করাই তাঁর উদ্দেশ্য।
বাংলাদেশের বেদে সম্প্রদায় নিয়ে এর আগে আমাদের এখানে ফটোগ্রাফিক কাজ হয়েছে। সেসব কাজের সামনে আরেয়ানোর কাজকে অনেকটাই ম্লান মনে হবে। আমাদেরকে বুঝতে হবে, আরেয়ানোর কাছে এই বিষয়টি নতুন। তাঁর এবিষয়ে জানাশোনাও সীমিত। সীমাবদ্ধতার মধ্যেও তিনি বাংলাদেশের একপ্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত ঘুরে বেড়িয়েছেন। তবে তাঁর কাজের মধ্যে তাড়াহুড়োর ছাপ স্পষ্ট। বেশ কয়েকটি পোরট্রেট আছে, দেখলে মনে হয় পরিকল্পনাহীন ‘পয়েন্ট-অ্যান্ড-শুট’। কয়েকটি পোরট্রেট মনে রাখার মতো। নৌকার ছাউনির নিচে বসা ‘কৃষ্ণকলি’ তরুণীর ছবি, নাকে নোলক, গলায় মালা। তাঁর নির্মল মুখটি যেন আবহমান বাংলার প্রতিচ্ছবি। তাঁর স্টিললাইফগুলোও ভাবনার খোরাক যোগায়। নদীপাড়ে বাঁশবনটি আর নেই, মাটিতে শেকড় গেড়ে এখনো টিকে থাকার চেষ্টায় বাঁশের গোড়াগুলো, এ যেন বেদেদের জীবন সংগ্রামেরই প্রতীকী ছবি। পায়রার ঘরের ছবিটি! নিজেদের ঘরের ঠিক নেই, কিন্তু কি যতেœ কোন বেদে যেন তৈরি করেছে ছোট্ট কাঠের ঘরটি। গাছের ডালে এলিয়ে থাকা হাতের ছবিটি ইলিউশন সৃষ্ট করে, যেন হাত নয়- গোখরার ফণা। নদীপাড়ের ভেজা বালিতে পড়ে থাকা নোঙরের ছবিটিও অর্থবহ। এ যেন বেদেদের জীবনেরই সমার্থক। আরেয়ানো বেশি ছবি ব্যবহার করেছেন। বেশি হওয়ায় এক পৃষ্ঠায় দুইয়ের অধিক ছবি ছাপা হয়েছে। ফলে অনেকগুলো পাতা দেখতে জবড়জং মনে হয়।
‘সভ্য সমাজে’ যাযাবরেরা অচ্ছুৎ হিসেবে বিবেচিত। যাযাবরেরা নিজেরাও তফাতে থেকে স্বস্তি পায়। বাংলাদেশের এই বঞ্চিত মানুষগুলোর পক্ষে এমন একটি আন্তর্জাতিক উদ্যোগকে স্বাগত জানাই। বাংলাদেশের এই পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে নিয়ে এমন বড় পরিসরে ফটোগ্রাফিক কাজ বিরল। উদ্যোক্তারা অভিনন্দন পাওয়ার যোগ্য। অভিবাদন জানাই, দুই আলোকচিত্রীকেও, তাদের কারণে এই জনগোষ্ঠীকে নিয়ে আরো ব্যতিক্রমধর্মী ফটোগ্রাফিক কাজ করার পথ সুগম হলো।

দৈনিক যুগান্তরের সাহিত্য সাময়িকীতে  প্রকাশিত, ৪ মে, ২০১৮

   

রাজীবের ডান হাত


Tragedy satisfies us even in the moment of distressing
-Lascelles Abercrombie (1881-1938)

পত্রিকার প্রথম পাতায় তিন কলামজুড়ে থাকা একটি সাধারণ ছবি। ছবিতে কোনো মানুষ নেই, এনভায়রনমেন্ট নেই, নেই কোনো অ্যাক্টিভিটি। যেন স্টিললাইফ ফটোগ্রাফ। তবে বুঝা যাচ্ছে দুটি নাগরিক বাসের একাংশের কোজআপ এটি। একটি বাস আরেকটি বাসের সঙ্গে লেপটে রয়েছে। তারই মাঝখানে আটকে আছে একটি হাত! মানুষের তাজা হাত! চেয়ার থেকে হুমড়ি খেয়ে পড়ার অবস্থা। শুধু হাত কেন! মানুষটা কোথায়! নেই তো! থাকার কোনো সম্ভাবনাও নেই, দুই বাসের মাঝখানে যে এক মিলিমিটার জায়গাও নেই। আমাদের আর বুঝতে বাকি থাকে না ওখানে শুধু হাতটিই আটকে আছে। হাতটি রয়ে গেছে আমাদের চোখে পট্টি বাঁধা প্রশাসনের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে যে, এই দেশে মানুষের দাম কতটা নিচে নেমে গেছে। নাগরিক অরাজকতা-নৈরাজ্য, অব্যবস্থাপনা ও অসারতার প্রতীক হয়ে দুই বাসের মাঝখানে টিকে আছে হাতটি। হাতটি আমাদেরকে অস্বস্তিতে ফেলে, প্রশ্নের মুখোমুখি করে, ডাকে! এই আবহই তৈরি হতো না যদি সাংবাদিক মিজানুর রহমান খান মুহূর্তটি ক্যামেরাবন্দি না করতেন। তিনি আলোকচিত্রী নন। কিন্তু তাঁর ছবি তা বলে না। স্পট নিউজ কভার করতে গিয়ে অনেক পেশাদার আলোকচিত্রীও ঘাবড়ে যান। কিন্তু জনাব মিজান যেহেতু একজন অভিজ্ঞ সাংবাদিক সেহেতু তিনি জানেন এমন পরিস্থিতিতে কীভাবে মাথা ঠা-া রাখতে হয়। তিনি ঠা-া মাথায় ছবিটি তুলেছেন, ঘটনাটি বর্ণনাও করেছেন। তাঁর মধ্যে অস্থিরতা ছিল না বলেই হয়তো তাঁর অজান্তেই ছবিটির কম্পোজিশন অনন্য উচ্চতায় স্থান পেয়েছে।
খুবই রিয়ালিস্টিক ছবি। একজনের শরীর থেকে একটি হাত বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে এবং তা ঝুলে আছে দ্ইু বাসের পেটের মাঝখানে। ছবিটি সত্যিকার অর্থেই ‘বীভৎস’ দৃশ্যের প্রতিলিপি হতে পারতো। কিন্তু তা হয়নি। ছবির কোথাও এক ফোঁটা রক্ত নেই। হাতটি দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার কোনো আলামতও নেই (যদিও তা হয়েছে)। একাধিক উজ্জ্বল রঙের মাঝখানে একটি স্থবির হাত- যেন ইনস্টলেশন (দৃশ্যশিল্পকর্ম)। এখানেই ছবিটির শক্তি। একটি হার্ডকোর নিউজ ছবি হয়েও তা দৃশ্যশিল্পকর্মের মতো দেখায়। হাতটির ভঙ্গিও দর্শককে টানে, যেন তা বাঁচতে চাইছে। যদিও যার হাত সেই রাজীব হোসেন আর বেঁচে নেই। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। তাহলে হাতটি আবার কোন বাঁচার কথা বলছে? এই ছবি আমাদেরকে জানিয়ে দিল, মুখ নয় বিশেষ সময়ে মানুষের হাতও কথা বলে ওঠে। ছবিটিতে চোখ রেখে আমাদের কষ্ট হয়, আমরা মূক হয়ে রাজীবের ডান হাতের চাপাস্বরের কথা শুনি। আসলে এধরণের শিল্পকর্মের সামনে দাঁড়িয়েও আমরা রস গ্রহণ করি। সংস্কৃত প-িতেরা এই রসেরর নাম দিয়েছেন করুণ রস,
“করুণদাবপি রসে জায়তে যৎ পরং সুখম্
সচেতসামনুভবং প্রমাণং তত্র কেবলম্ ॥”
করুণ রস পাই, কারণ কারো করুণ অবস্থা দেখে আমরা তার সঙ্গে একাত্মতা বোধ করি এবং ওই অবস্থায় নিজেকে প্রতিস্থান করে আমরা ভীতি অনুভব করি। করুণ অবস্থায় না পড়েও আমরা সেই অবস্থাটা অনুভব করি।
সুতরাং, এই ছবি শুধু সংবাদই বহন করে না, একটি সার্থক শিল্পকর্মের বিভিন্ন উপাদানও বহন করছে।
এটি সিটিজেন জার্নালিজমেরও উৎকৃষ্ট উদাহরণ। প্রাযুক্তিক যুগে ঘটনা আর পেশাদার ফটোসাংবাদিক, ক্যামেরাপারসন ও প্রতিবেদকের জন্য অপেক্ষা করে না। তথ্য-প্রযুক্তির প্রসারের কারণে তাৎক্ষণিকভাবে সংবাদ মুক্তি পেয়ে যাচ্ছে ভিডিও, স্থিরচিত্র ও টেক্সট ফরম্যাটে। মিজানুর রহমান খানও তার পত্রিকার ফটোসাংবাদিক বা প্রতিবেদকের জন্য অপেক্ষা করেননি, তিনি নিজেই তাঁর সঙ্গে থাকা মোবাইলফোন ক্যামেরা দিয়ে ছবি তুলেছেন, তথ্য নিয়েছেন এবং বস্তুনিষ্ঠ খবর পাঠকের কাছে সরবরাহ করেছেন। ফটোসাংবাদিকের অপেক্ষায় থাকলে এই ‘মোমেন্ট’ হারিয়ে যেতে পারতো, তখনও হয়তো আমরা খবর পেতাম, ছবিও দেখতামÑ কিন্তু হয়তো তা আমাদের সেভাবে নাড়া দিতো না, ভাবাতো না- এখন যেভাবে আমার বোধকে নাড়িয়ে দিলো।
কোন আলোকচিত্র টিকে থাকবে, কোনটি কালের গর্ভে তলিয়ে যাবে তা নির্দিষ্ট করে বলা যায় না। সময়ই তা বলে দেয়। আলোকচিত্রের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, যে ছবি মানবিক, বৃহৎ জনগোষ্ঠীর বিবেককে নাড়া দেয় এবং যে আলোকচিত্রের বিষয় সার্বজনীন ও সর্বকালীন তা টিকে থাকে, মনে থাকে। অনেক কারণেই আলোচিত ছবিটি দীর্ঘদিন টিকে থাকবে। অস্থির ও অপরিকল্পিত নগর এবং বিশৃঙ্খলায় নিমজ্জিত নাগরিক জীবনের প্রতিনিধিত্ব করছে এই ছবি। সহসাই সুশীল হয়ে যাচ্ছে না আমাদের দৈনন্দিন জীবন। সুতরাং এই ছবিও আমাদের স্মৃতিতে থেকে যাবে। এটিই এই ছবির টিকে থাকার প্রধান কারণ বলে আমি মনে করি।

প্রবন্ধটি প্রথম আলো বন্ধুসভার ‌‌'তারুণ্য' পত্রিকায় প্রকাশিত হয়, আগস্ট ২০১৮ সংখ্যা