Wednesday, July 1, 2020

নাসির আলী মামুন পাঠ

দেশের ফটোগ্রাফির ইতিহাসে নাসির আলী মামুন প্রথম প্রভাবশালী আলোকচিত্রী। সত্তরের দশকের গোড়ার দিকে ফটোগ্রাফি দুনিয়ায় তাঁর আগমন। শুরু থেকেই তিনি একনিষ্ঠভাবে পোরট্রেট-বন্দনায় ব্রত। সেসময় আমাদের এখানে পোরট্রেট ঘরানা হিসেবে গড়ে ওঠেনি। পোরট্রেট করা ছিল মামুলি ব্যাপার। নাসির আলী মামুন এই অবহেলিত ক্ষেত্রটিতে হাত দিলেন। বাংলাদেশের পোরট্রেট ফটোগ্রাফি পেলো একজন ধীমান অভিভাবক। বাংলাদেশের ফটোগ্রাফির ইতিহাসে এটি ছিল এক অবিস্মরণীয় ঘটনা। সত্তরের দশকের টালমাটাল পরিস্থিতিতে একজন মানুষ নিজের অর্থনৈতিক ভিত্তি মজবুত করার ফিকির বাদ দিয়ে আলোকচিত্রকলাচর্চায় নেমে পড়লেন! তাও আবার বেছে নিলেন অলাভজনক ধারা—‘পোরট্রেট ফটোগ্রাফি’। সেসময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতায় এমন সিদ্ধান্ত নেয়া প্রায় অসম্ভব ছিল। যাইহোক। তাঁর একক প্রচেষ্টায় পোরট্রেট ফটোগ্রাফি দৃঢ় মেরুদণ্ড নিয়ে দাঁড়িয়ে গেলো। তাঁর এই দুঃসাহসিক অভিযান শুধু সফলতা পেলো তা নয়; তা আজ পর্যন্ত প্রভাবিত করছে আমাদের। তিনি তাঁর অজান্তেই একটি ফটোগ্রাফিক-বলয় তৈরি করে ফেলেছেন। পরবর্তী প্রজন্মের অনেকেই ‘মামুনীয়’ বলয় থেকে বের হতে পারেননি। অনেকে অবচেতন মনেই নাসির আলী মামুনকে অনুসরণ করেন। যে শিল্পীর জীবদ্দশায় তাঁর কাজ বছরের পর বছর প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয় তখন আমরা সেই শিল্পীকে জীবন্ত কিংবদন্তি না বলে পারি না। কবি শামসুর রাহমান তাঁকে নামকা বাস্তে ‘ক্যামেরার কবি’ বলেননি। নাসির আলী মামুনের করা আলোকচিত্রকর্মগুলো একের পর এক দেখে যেতে পারলে এই কথার মর্ম অনুধাবন করা যায়। ছবিগুলো দেখতে দেখতে যেকোনো শিল্পমনা মানুষ ঘোরের মধ্যে পড়ে যাবেন। মনে হবে, আরো দেখি, আরো দেখি। একটি বইয়ে অনেক কবিতা থাকে। কবিতাগুলোর বিষয় ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু শব্দ, ছন্দ, অনুপ্রাস ও অন্তমিলের সুরে একটি কবিতা অন্যটির সঙ্গে যুক্তÑ যাকে আমরা হারমনি বলি। এই হারমনি নাসির আলী মামুনের আলোকচিত্রকর্মগুলোতেও রয়েছে। ভিন্ন মানুষ, ভিন্ন তাদের ব্যক্তিত্ব ও কর্মক্ষেত্র। কিন্তু টোন, আলোর কারুকাজ এবং সর্বোপরি ‘সিমপ্লিসিটি’ শিল্পকর্মগুলোকে এক সুতোয় বেঁধেছে। ‘আলো ছায়ার নাসির আলী মামুন’ গ্রন্থে নাসির আলী মামুনও বলেছেন, ‘তার (মডেল) মুখে আমি অনেক অক্ষর দেখি। সেই অক্ষর দিয়া আমি যুৎসই বাক্য রচনা করি। আলো-ছায়ার খেলা করি। আমি আমার মডেলকে আবিষ্কার করি।’ ২০১৮ সালে নাসির আলী মামুনের পোরট্রেটগুলো একসঙ্গে দেখার সুবর্ণ সুযোগ করে দেয় বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর। তারা আলোকচিত্রশিল্পীর করা ১২৪টি পোরট্রেট নিয়ে ‘ফটোজিয়াম’ শীর্ষক একক প্রদর্শনীর আয়োজন করে। প্রায় সাড়ে চার দশকের ছবি একটি প্রদর্শন কক্ষে কম্পোজ করা হলো! বিস্ময় ও মুগ্ধতা নিয়ে ছবিগুলো দেখেছি। কিছু ছবি আগে দেখা, বেশিরভাগই প্রথম দেখলাম। শুরু হয়েছে ভাসানী-বঙ্গবন্ধু-কবি নজরুলকে দিয়ে শেষ হয়েছে ফজলে হাসান আবেদ-অমর্ত্য সেন-হুমায়ূন আহমেদকে দিয়ে। প্রতিটি ছবি নিয়ে আলোচনা করা যায়। প্রতিটি ছবিই যেমন দৃষ্টিনন্দন, একইভাবে সুখপাঠ্য। এই পোরট্রেটগুলোর নান্দনিক দিক ছাড়াও আছে ঐতিহাসিক মূল্য। বাংলাদেশকে চিনতে ও বুঝতে এই আলোকচিত্রকর্মগুলো আমাদের সাহায্য করে। তাই তো আলোকচিত্রী, মানবাধিকার কর্মী ও সংগঠক শহিদুল আলম নাসির আলী মামুনের ছবিগুলোকে ‘বাংলাদেশের পরিচয়’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। যতই দিন যাচ্ছে পোরট্রেটগুলোর কদর বাড়ছে। নাসির আলী মামুনের ছবিগুলোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য—ছবিগুলোর সাধারণত্ব। কোনো আড়ম্বর নেই, কাউকে বিখ্যাত হিসেবে তুলে ধরার তোড়জোর নেই, নেই অভিনয় ও কৃত্রিমতা। যে যেখানে যেমন—তেমনই রাখা। ছবিগুলোতে একদিকে ছবির ব্যক্তির বাস্তবতা ধরা পড়েছে, অন্যদিকে ছবির সাদাকালো টোনাল কোয়ালিটি এবং আলো-অন্ধকারের ভারসাম্য ছবিতে এনেছে মাধুর্য। আর করকরে ফোকাস ব্যক্তির ব্যক্তিত্বকে করেছে দৃঢ় ও প্রাণবন্ত। সেই প্রদর্শনীর অপূর্ব ক্যাটালগটি সংগ্রহের সৌভাগ্য আমার হয়েছে। নাসির আলী মামুনের কোনো বইও এতো অনবদ্য হয়নি যতটা অনবদ্য এই ক্যাটালগ। প্রায়ই ক্যাটালগের পাতাগুলো উল্টাই। দুচোখ ভরে পাঠ করি একজন নাসির আলী মামুনকে। বুঝি, ক্যামেরা বা ক্যামেরা সরঞ্জাম আলোকচিত্রকর্মগুলোকে কালজয়ী করেনি, এগুলোকে কালজয়ী করেছে কাজের প্রতি শিল্পীর নিষ্ঠা ও ভালোবাসা। প্রথম প্রকাশ: কথন-২ ম্যাগাজিন, শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রেসক্লাব, সিলেট