সুদীপ্ত সালাম
Wednesday, July 1, 2020
নাসির আলী মামুন পাঠ
দেশের ফটোগ্রাফির ইতিহাসে নাসির আলী মামুন প্রথম প্রভাবশালী আলোকচিত্রী। সত্তরের দশকের গোড়ার দিকে ফটোগ্রাফি দুনিয়ায় তাঁর আগমন। শুরু থেকেই তিনি একনিষ্ঠভাবে পোরট্রেট-বন্দনায় ব্রত। সেসময় আমাদের এখানে পোরট্রেট ঘরানা হিসেবে গড়ে ওঠেনি। পোরট্রেট করা ছিল মামুলি ব্যাপার। নাসির আলী মামুন এই অবহেলিত ক্ষেত্রটিতে হাত দিলেন। বাংলাদেশের পোরট্রেট ফটোগ্রাফি পেলো একজন ধীমান অভিভাবক। বাংলাদেশের ফটোগ্রাফির ইতিহাসে এটি ছিল এক অবিস্মরণীয় ঘটনা।
সত্তরের দশকের টালমাটাল পরিস্থিতিতে একজন মানুষ নিজের অর্থনৈতিক ভিত্তি মজবুত করার ফিকির বাদ দিয়ে আলোকচিত্রকলাচর্চায় নেমে পড়লেন! তাও আবার বেছে নিলেন অলাভজনক ধারা—‘পোরট্রেট ফটোগ্রাফি’। সেসময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতায় এমন সিদ্ধান্ত নেয়া প্রায় অসম্ভব ছিল।
যাইহোক। তাঁর একক প্রচেষ্টায় পোরট্রেট ফটোগ্রাফি দৃঢ় মেরুদণ্ড নিয়ে দাঁড়িয়ে গেলো। তাঁর এই দুঃসাহসিক অভিযান শুধু সফলতা পেলো তা নয়; তা আজ পর্যন্ত প্রভাবিত করছে আমাদের। তিনি তাঁর অজান্তেই একটি ফটোগ্রাফিক-বলয় তৈরি করে ফেলেছেন। পরবর্তী প্রজন্মের অনেকেই ‘মামুনীয়’ বলয় থেকে বের হতে পারেননি। অনেকে অবচেতন মনেই নাসির আলী মামুনকে অনুসরণ করেন। যে শিল্পীর জীবদ্দশায় তাঁর কাজ বছরের পর বছর প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয় তখন আমরা সেই শিল্পীকে জীবন্ত কিংবদন্তি না বলে পারি না।
কবি শামসুর রাহমান তাঁকে নামকা বাস্তে ‘ক্যামেরার কবি’ বলেননি। নাসির আলী মামুনের করা আলোকচিত্রকর্মগুলো একের পর এক দেখে যেতে পারলে এই কথার মর্ম অনুধাবন করা যায়। ছবিগুলো দেখতে দেখতে যেকোনো শিল্পমনা মানুষ ঘোরের মধ্যে পড়ে যাবেন। মনে হবে, আরো দেখি, আরো দেখি। একটি বইয়ে অনেক কবিতা থাকে। কবিতাগুলোর বিষয় ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু শব্দ, ছন্দ, অনুপ্রাস ও অন্তমিলের সুরে একটি কবিতা অন্যটির সঙ্গে যুক্তÑ যাকে আমরা হারমনি বলি। এই হারমনি নাসির আলী মামুনের আলোকচিত্রকর্মগুলোতেও রয়েছে। ভিন্ন মানুষ, ভিন্ন তাদের ব্যক্তিত্ব ও কর্মক্ষেত্র। কিন্তু টোন, আলোর কারুকাজ এবং সর্বোপরি ‘সিমপ্লিসিটি’ শিল্পকর্মগুলোকে এক সুতোয় বেঁধেছে। ‘আলো ছায়ার নাসির আলী মামুন’ গ্রন্থে নাসির আলী মামুনও বলেছেন, ‘তার (মডেল) মুখে আমি অনেক অক্ষর দেখি। সেই অক্ষর দিয়া আমি যুৎসই বাক্য রচনা করি। আলো-ছায়ার খেলা করি। আমি আমার মডেলকে আবিষ্কার করি।’
২০১৮ সালে নাসির আলী মামুনের পোরট্রেটগুলো একসঙ্গে দেখার সুবর্ণ সুযোগ করে দেয় বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর। তারা আলোকচিত্রশিল্পীর করা ১২৪টি পোরট্রেট নিয়ে ‘ফটোজিয়াম’ শীর্ষক একক প্রদর্শনীর আয়োজন করে। প্রায় সাড়ে চার দশকের ছবি একটি প্রদর্শন কক্ষে কম্পোজ করা হলো! বিস্ময় ও মুগ্ধতা নিয়ে ছবিগুলো দেখেছি। কিছু ছবি আগে দেখা, বেশিরভাগই প্রথম দেখলাম। শুরু হয়েছে ভাসানী-বঙ্গবন্ধু-কবি নজরুলকে দিয়ে শেষ হয়েছে ফজলে হাসান আবেদ-অমর্ত্য সেন-হুমায়ূন আহমেদকে দিয়ে। প্রতিটি ছবি নিয়ে আলোচনা করা যায়। প্রতিটি ছবিই যেমন দৃষ্টিনন্দন, একইভাবে সুখপাঠ্য।
এই পোরট্রেটগুলোর নান্দনিক দিক ছাড়াও আছে ঐতিহাসিক মূল্য। বাংলাদেশকে চিনতে ও বুঝতে এই আলোকচিত্রকর্মগুলো আমাদের সাহায্য করে। তাই তো আলোকচিত্রী, মানবাধিকার কর্মী ও সংগঠক শহিদুল আলম নাসির আলী মামুনের ছবিগুলোকে ‘বাংলাদেশের পরিচয়’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। যতই দিন যাচ্ছে পোরট্রেটগুলোর কদর বাড়ছে।
নাসির আলী মামুনের ছবিগুলোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য—ছবিগুলোর সাধারণত্ব। কোনো আড়ম্বর নেই, কাউকে বিখ্যাত হিসেবে তুলে ধরার তোড়জোর নেই, নেই অভিনয় ও কৃত্রিমতা। যে যেখানে যেমন—তেমনই রাখা। ছবিগুলোতে একদিকে ছবির ব্যক্তির বাস্তবতা ধরা পড়েছে, অন্যদিকে ছবির সাদাকালো টোনাল কোয়ালিটি এবং আলো-অন্ধকারের ভারসাম্য ছবিতে এনেছে মাধুর্য। আর করকরে ফোকাস ব্যক্তির ব্যক্তিত্বকে করেছে দৃঢ় ও প্রাণবন্ত।
সেই প্রদর্শনীর অপূর্ব ক্যাটালগটি সংগ্রহের সৌভাগ্য আমার হয়েছে। নাসির আলী মামুনের কোনো বইও এতো অনবদ্য হয়নি যতটা অনবদ্য এই ক্যাটালগ। প্রায়ই ক্যাটালগের পাতাগুলো উল্টাই। দুচোখ ভরে পাঠ করি একজন নাসির আলী মামুনকে। বুঝি, ক্যামেরা বা ক্যামেরা সরঞ্জাম আলোকচিত্রকর্মগুলোকে কালজয়ী করেনি, এগুলোকে কালজয়ী করেছে কাজের প্রতি শিল্পীর নিষ্ঠা ও ভালোবাসা।
প্রথম প্রকাশ: কথন-২ ম্যাগাজিন, শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রেসক্লাব, সিলেট
Thursday, December 20, 2018
যাযাবর দৃশ্যাবলি
হলুদে বর্ণের ৯ বাই ১১ ইঞ্চির চ্যাপ্টা বইটি যেদিন হাতে পাই সেদিনই ভেবেছি বইটি নিয়ে লিখবো। হ্যাঁ, বইটির ডানা দুটি না খুলেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। বইয়ের প্রচ্ছদ আমার কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রচ্ছদ ভালো না হলে আমার মন বইটি কিনতে সায় দেয় না। সদ্য প্রকাশিত ‘দেসতেরাদোস’ শিরোনামের ছবির বইটির (ফটোবুক) প্রচ্ছদ দেখেই মাত হয়েছিলাম। প্রচ্ছদের হলুদ জমিনে হালকা সবুজ রঙের প্রিমিটিভ নকশার পুনরাবৃত্তি বইয়ের প্রচ্ছদটিকে করেছে নান্দনিক ও গম্ভীর। প্রিমিটিভ বা ফোক আর্ট কেন ব্যবহার করা হয়েছে তা এই বই-আলোচনা থেকেই আমরা বুঝতে পারবো। স্পেনিশ ‘দেসতেরাদোস’ শব্দের বাংলা ও ইংরেজি অর্থ ‘নির্বাসিত’। ছবির বইটি বাংলাদেশের বিভিন্ন যাযাবর সম্প্রদায়ের মানুষদেরকে নিয়ে। যাযাবরদের কোনো ঠিকানা নেই, স্থায়ী বসতি নেই, শেকড় নেইÑ তারা তো এক অর্থে নির্বাসিতই। বইটি স্পেন থেকে বের হয়েছে। বের করেছে ইনডিটেক্স চেয়ার অব স্প্যানিশ ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যান্ড কালচার। বাংলাদেশ ও স্পেনের মধ্যকার শিা ও সাংস্কৃতিক বিনিময় কর্মসূচির অংশ হিসেবে বইটি বের করা হয়েছে। তাই অমূল্য এই বইটির কোনো দাম রাখা হয়নি। এই বই-প্রকল্পে কাজ করেছেন বাংলাদেশের আলোকচিত্রী সুমন ইউসুফ ও স্পেনের সালভাদর আরেয়ানো। বইটিতে সুমন ইউসুফের ৩০টি এবং সালভাদর আরেয়ানোর অর্ধশত ছবি স্থান পেয়েছে। বইটির একদিক শুরু হয় সুমনের ৩০টি ছবির ঝাঁপি নিয়ে। এই অংশের নাম রাখা হয়েছে ‘নোমাদাস’ (যাযাবর)। অন্যপাশের প্রচ্ছদ খুললে আরেয়ানো তোলা ছবি। এই অংশের উপনাম ‘পেজ দে সোমব্রা’ (ছায়ামাছ)। তিনি এই শিরোনামটি নিয়েছেন বিখ্যাত স্পেনিশ কবি ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকার যাযাবরদের নিয়ে লেখা একটি কবিতা থেকে।
![]() |
| © সুমন ইউসুফ |
![]() |
| © সালভাদর আরেয়ানো |
বাংলাদেশের বেদে সম্প্রদায় নিয়ে এর আগে আমাদের এখানে ফটোগ্রাফিক কাজ হয়েছে। সেসব কাজের সামনে আরেয়ানোর কাজকে অনেকটাই ম্লান মনে হবে। আমাদেরকে বুঝতে হবে, আরেয়ানোর কাছে এই বিষয়টি নতুন। তাঁর এবিষয়ে জানাশোনাও সীমিত। সীমাবদ্ধতার মধ্যেও তিনি বাংলাদেশের একপ্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত ঘুরে বেড়িয়েছেন। তবে তাঁর কাজের মধ্যে তাড়াহুড়োর ছাপ স্পষ্ট। বেশ কয়েকটি পোরট্রেট আছে, দেখলে মনে হয় পরিকল্পনাহীন ‘পয়েন্ট-অ্যান্ড-শুট’। কয়েকটি পোরট্রেট মনে রাখার মতো। নৌকার ছাউনির নিচে বসা ‘কৃষ্ণকলি’ তরুণীর ছবি, নাকে নোলক, গলায় মালা। তাঁর নির্মল মুখটি যেন আবহমান বাংলার প্রতিচ্ছবি। তাঁর স্টিললাইফগুলোও ভাবনার খোরাক যোগায়। নদীপাড়ে বাঁশবনটি আর নেই, মাটিতে শেকড় গেড়ে এখনো টিকে থাকার চেষ্টায় বাঁশের গোড়াগুলো, এ যেন বেদেদের জীবন সংগ্রামেরই প্রতীকী ছবি। পায়রার ঘরের ছবিটি! নিজেদের ঘরের ঠিক নেই, কিন্তু কি যতেœ কোন বেদে যেন তৈরি করেছে ছোট্ট কাঠের ঘরটি। গাছের ডালে এলিয়ে থাকা হাতের ছবিটি ইলিউশন সৃষ্ট করে, যেন হাত নয়- গোখরার ফণা। নদীপাড়ের ভেজা বালিতে পড়ে থাকা নোঙরের ছবিটিও অর্থবহ। এ যেন বেদেদের জীবনেরই সমার্থক। আরেয়ানো বেশি ছবি ব্যবহার করেছেন। বেশি হওয়ায় এক পৃষ্ঠায় দুইয়ের অধিক ছবি ছাপা হয়েছে। ফলে অনেকগুলো পাতা দেখতে জবড়জং মনে হয়।
‘সভ্য সমাজে’ যাযাবরেরা অচ্ছুৎ হিসেবে বিবেচিত। যাযাবরেরা নিজেরাও তফাতে থেকে স্বস্তি পায়। বাংলাদেশের এই বঞ্চিত মানুষগুলোর পক্ষে এমন একটি আন্তর্জাতিক উদ্যোগকে স্বাগত জানাই। বাংলাদেশের এই পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে নিয়ে এমন বড় পরিসরে ফটোগ্রাফিক কাজ বিরল। উদ্যোক্তারা অভিনন্দন পাওয়ার যোগ্য। অভিবাদন জানাই, দুই আলোকচিত্রীকেও, তাদের কারণে এই জনগোষ্ঠীকে নিয়ে আরো ব্যতিক্রমধর্মী ফটোগ্রাফিক কাজ করার পথ সুগম হলো।
দৈনিক যুগান্তরের সাহিত্য সাময়িকীতে প্রকাশিত, ৪ মে, ২০১৮
দৈনিক যুগান্তরের সাহিত্য সাময়িকীতে প্রকাশিত, ৪ মে, ২০১৮
রাজীবের ডান হাত
Tragedy satisfies us even in the moment of distressing
-Lascelles Abercrombie (1881-1938)
পত্রিকার প্রথম পাতায় তিন কলামজুড়ে থাকা একটি সাধারণ ছবি। ছবিতে কোনো মানুষ নেই, এনভায়রনমেন্ট নেই, নেই কোনো অ্যাক্টিভিটি। যেন স্টিললাইফ ফটোগ্রাফ। তবে বুঝা যাচ্ছে দুটি নাগরিক বাসের একাংশের কোজআপ এটি। একটি বাস আরেকটি বাসের সঙ্গে লেপটে রয়েছে। তারই মাঝখানে আটকে আছে একটি হাত! মানুষের তাজা হাত! চেয়ার থেকে হুমড়ি খেয়ে পড়ার অবস্থা। শুধু হাত কেন! মানুষটা কোথায়! নেই তো! থাকার কোনো সম্ভাবনাও নেই, দুই বাসের মাঝখানে যে এক মিলিমিটার জায়গাও নেই। আমাদের আর বুঝতে বাকি থাকে না ওখানে শুধু হাতটিই আটকে আছে। হাতটি রয়ে গেছে আমাদের চোখে পট্টি বাঁধা প্রশাসনের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে যে, এই দেশে মানুষের দাম কতটা নিচে নেমে গেছে। নাগরিক অরাজকতা-নৈরাজ্য, অব্যবস্থাপনা ও অসারতার প্রতীক হয়ে দুই বাসের মাঝখানে টিকে আছে হাতটি। হাতটি আমাদেরকে অস্বস্তিতে ফেলে, প্রশ্নের মুখোমুখি করে, ডাকে! এই আবহই তৈরি হতো না যদি সাংবাদিক মিজানুর রহমান খান মুহূর্তটি ক্যামেরাবন্দি না করতেন। তিনি আলোকচিত্রী নন। কিন্তু তাঁর ছবি তা বলে না। স্পট নিউজ কভার করতে গিয়ে অনেক পেশাদার আলোকচিত্রীও ঘাবড়ে যান। কিন্তু জনাব মিজান যেহেতু একজন অভিজ্ঞ সাংবাদিক সেহেতু তিনি জানেন এমন পরিস্থিতিতে কীভাবে মাথা ঠা-া রাখতে হয়। তিনি ঠা-া মাথায় ছবিটি তুলেছেন, ঘটনাটি বর্ণনাও করেছেন। তাঁর মধ্যে অস্থিরতা ছিল না বলেই হয়তো তাঁর অজান্তেই ছবিটির কম্পোজিশন অনন্য উচ্চতায় স্থান পেয়েছে।
খুবই রিয়ালিস্টিক ছবি। একজনের শরীর থেকে একটি হাত বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে এবং তা ঝুলে আছে দ্ইু বাসের পেটের মাঝখানে। ছবিটি সত্যিকার অর্থেই ‘বীভৎস’ দৃশ্যের প্রতিলিপি হতে পারতো। কিন্তু তা হয়নি। ছবির কোথাও এক ফোঁটা রক্ত নেই। হাতটি দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার কোনো আলামতও নেই (যদিও তা হয়েছে)। একাধিক উজ্জ্বল রঙের মাঝখানে একটি স্থবির হাত- যেন ইনস্টলেশন (দৃশ্যশিল্পকর্ম)। এখানেই ছবিটির শক্তি। একটি হার্ডকোর নিউজ ছবি হয়েও তা দৃশ্যশিল্পকর্মের মতো দেখায়। হাতটির ভঙ্গিও দর্শককে টানে, যেন তা বাঁচতে চাইছে। যদিও যার হাত সেই রাজীব হোসেন আর বেঁচে নেই। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। তাহলে হাতটি আবার কোন বাঁচার কথা বলছে? এই ছবি আমাদেরকে জানিয়ে দিল, মুখ নয় বিশেষ সময়ে মানুষের হাতও কথা বলে ওঠে। ছবিটিতে চোখ রেখে আমাদের কষ্ট হয়, আমরা মূক হয়ে রাজীবের ডান হাতের চাপাস্বরের কথা শুনি। আসলে এধরণের শিল্পকর্মের সামনে দাঁড়িয়েও আমরা রস গ্রহণ করি। সংস্কৃত প-িতেরা এই রসেরর নাম দিয়েছেন করুণ রস,
“করুণদাবপি রসে জায়তে যৎ পরং সুখম্
সচেতসামনুভবং প্রমাণং তত্র কেবলম্ ॥”
করুণ রস পাই, কারণ কারো করুণ অবস্থা দেখে আমরা তার সঙ্গে একাত্মতা বোধ করি এবং ওই অবস্থায় নিজেকে প্রতিস্থান করে আমরা ভীতি অনুভব করি। করুণ অবস্থায় না পড়েও আমরা সেই অবস্থাটা অনুভব করি।
সুতরাং, এই ছবি শুধু সংবাদই বহন করে না, একটি সার্থক শিল্পকর্মের বিভিন্ন উপাদানও বহন করছে।
এটি সিটিজেন জার্নালিজমেরও উৎকৃষ্ট উদাহরণ। প্রাযুক্তিক যুগে ঘটনা আর পেশাদার ফটোসাংবাদিক, ক্যামেরাপারসন ও প্রতিবেদকের জন্য অপেক্ষা করে না। তথ্য-প্রযুক্তির প্রসারের কারণে তাৎক্ষণিকভাবে সংবাদ মুক্তি পেয়ে যাচ্ছে ভিডিও, স্থিরচিত্র ও টেক্সট ফরম্যাটে। মিজানুর রহমান খানও তার পত্রিকার ফটোসাংবাদিক বা প্রতিবেদকের জন্য অপেক্ষা করেননি, তিনি নিজেই তাঁর সঙ্গে থাকা মোবাইলফোন ক্যামেরা দিয়ে ছবি তুলেছেন, তথ্য নিয়েছেন এবং বস্তুনিষ্ঠ খবর পাঠকের কাছে সরবরাহ করেছেন। ফটোসাংবাদিকের অপেক্ষায় থাকলে এই ‘মোমেন্ট’ হারিয়ে যেতে পারতো, তখনও হয়তো আমরা খবর পেতাম, ছবিও দেখতামÑ কিন্তু হয়তো তা আমাদের সেভাবে নাড়া দিতো না, ভাবাতো না- এখন যেভাবে আমার বোধকে নাড়িয়ে দিলো।
কোন আলোকচিত্র টিকে থাকবে, কোনটি কালের গর্ভে তলিয়ে যাবে তা নির্দিষ্ট করে বলা যায় না। সময়ই তা বলে দেয়। আলোকচিত্রের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, যে ছবি মানবিক, বৃহৎ জনগোষ্ঠীর বিবেককে নাড়া দেয় এবং যে আলোকচিত্রের বিষয় সার্বজনীন ও সর্বকালীন তা টিকে থাকে, মনে থাকে। অনেক কারণেই আলোচিত ছবিটি দীর্ঘদিন টিকে থাকবে। অস্থির ও অপরিকল্পিত নগর এবং বিশৃঙ্খলায় নিমজ্জিত নাগরিক জীবনের প্রতিনিধিত্ব করছে এই ছবি। সহসাই সুশীল হয়ে যাচ্ছে না আমাদের দৈনন্দিন জীবন। সুতরাং এই ছবিও আমাদের স্মৃতিতে থেকে যাবে। এটিই এই ছবির টিকে থাকার প্রধান কারণ বলে আমি মনে করি।
প্রবন্ধটি প্রথম আলো বন্ধুসভার 'তারুণ্য' পত্রিকায় প্রকাশিত হয়, আগস্ট ২০১৮ সংখ্যা
Tuesday, April 25, 2017
Sunday, August 10, 2014
"বিখ্যাত মানুষদের ছবি তুলতে আমার আঙুল ক্লান্ত প্রজাপতির মতো নড়তে থাকে"- নাসির আলী মামুন
বাংলাদেশে পোরট্রেট ফটোগ্রাফি বিকশিত হয়েছে নাসির আলী মামুনের একাগ্র একক প্রচেষ্টায় এবং তিনি এদেশে পোরট্রেট ফটোগ্রাফির সূচনা করেন। তাকে দেশি পোরট্রেট ফটোগ্রাফির জীবন্ত কিংবদন্তি বললে ভুল হবে না। খ্যাতিমান মানুষদের বিভিন্ন দুর্লভ মুহূর্ত অনুসন্ধানী ক্যামেরায় বন্দি করা তার একমাত্র নেশা। গত ৪০ বছরে দেশি-বিদেশি শত শত ব্যক্তিত্বকে তিনি ক্যামেরাবন্দি করেছেন। তার সংগ্রহে আছে কমপক্ষে ৩৫ জন নোবেল বিজয়ী ব্যক্তির পোরট্রেট এবং আলো ও আঁধারের কারুকাজে প্রতিটি পোরট্রেটকে করেছে জীবন্ত। কবি শামসুর রাহমান তাকে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন ‘ক্যামেরার কবি’ হিসেবে। এটি সেই নিভৃতচারী ক্যামেরার কবির সাক্ষাৎকার
সময়ের আলোচিত ৫ আলোকচিত্রী
শুরুটা স্মরণীয়। বিভিন্ন সময় বাংলাদেশের আলোকচিত্রীরা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পুরস্কার অর্জন করেছেন। সে অর্জনের ধারা অব্যাহত। অর্জনের দিক থেকে ২০১৪ সাল স্মরণীয় এবং অন্তত বাংলাদেশের ফটোগ্রাফির জন্য ঐতিহাসিকও। বছরের শুরুতেই আমাদের আলোকচিত্রীা বেশকিছু বিরল ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কার ও সম্মাননা অর্জন করেছেন। ফলে বিশ্বফটোগ্রাফিতে বাংলাদেশ আবারো একটি উচ্চতর আসনের অধিকারী হয়েছে। যে প্রতিভাবান আলোকচিত্রীরা বাংলাদেশকে আবারো বিশ্বদরবারে সসম্মানে তুলে ধরেছেন তাদের কয়েকজনকে নিয়ে এই নিবন্ধ
'আপনার মেধার প্রমাণ আপনার চূড়ান্ত ছবি' - স্টিভ ম্যাককারি
"কবিতা লেখা
শেষ করে সামনে রাখুন, পড়ুন, কেউ আপনাকে প্রশ্ন করবে না আপনি কি এটা হাতে
লিখেছেন নাকি টাইপ করেছেন। আপনি কবিতাটি লিখতে কত সময় ব্যয় করেছেন, কতবার
খসড়া করেছিলেন, তা নিয়েও কেউ মাথা ঘামাবে না। আপনি কত ছবি তুলেছেন তাতে
কিছুই যায়-আসে না। আপনার মেধার প্রমাণ আপনার চূড়ান্ত ছবি"
Subscribe to:
Posts (Atom)



