বাংলাদেশে পোরট্রেট ফটোগ্রাফি বিকশিত হয়েছে নাসির আলী মামুনের একাগ্র একক প্রচেষ্টায় এবং তিনি এদেশে পোরট্রেট ফটোগ্রাফির সূচনা করেন। তাকে দেশি পোরট্রেট ফটোগ্রাফির জীবন্ত কিংবদন্তি বললে ভুল হবে না। খ্যাতিমান মানুষদের বিভিন্ন দুর্লভ মুহূর্ত অনুসন্ধানী ক্যামেরায় বন্দি করা তার একমাত্র নেশা। গত ৪০ বছরে দেশি-বিদেশি শত শত ব্যক্তিত্বকে তিনি ক্যামেরাবন্দি করেছেন। তার সংগ্রহে আছে কমপক্ষে ৩৫ জন নোবেল বিজয়ী ব্যক্তির পোরট্রেট এবং আলো ও আঁধারের কারুকাজে প্রতিটি পোরট্রেটকে করেছে জীবন্ত। কবি শামসুর রাহমান তাকে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন ‘ক্যামেরার কবি’ হিসেবে। এটি সেই নিভৃতচারী ক্যামেরার কবির সাক্ষাৎকার
প্রশ্ন : মামুন ভাই শুরুর কথা শুনি? আপনার জন্ম তো ঢাকাতেই?
নাসির আলী মামুন : এতো কথা কইতে গেলে তো দেরি হইয়া যাইবো। তারপরও আমি খুব সংক্ষেপে বলি। আমার জন্ম হইছি৬েলা ১৯৫৩ সালের পহেলা জুলাই পুরনো ঢাকার মৌলভীবাজারে। তখন মৌলভীবাজার ছিল বিরাট এক বাজার। মৌলভীবাজারে একটা পুরনো দোতলা বাড়িতে তহন আমরা ভাড়া থাকতাম। আমার বাবা হাইকোর্টে চাকরি করতো। পুরান ঢাকা এলাকাতেই আমার শিশুকাল কাটছে। ঢাকাইয়া কুট্টিদের মতন আমি তখন কথা কইতাম। কথা বলা যখন আমি শিখছি তখন থেইকাই ঢাকাইয়া কুট্টিদের মতন কইরা কথা বলার চেষ্টা করতাম। শুধু ভাষাই না, আচরণও ওদের মতন ছিল। ছোটবেলায় নাকি অনেক গালিটালি দিতাম। আমার মনে নাই, আব্বা-আম্মার কাছ থেইকা শুনছি । আমার স্কুল জীবন শুরু হওয়ার আগে আমরা থাকতাম হাইকোর্ট এলাকায়- নতুন হাইকোর্ট এখন যেইখানে সেইখানে আগে কোয়াটারের মতো অনেক বিল্ডিং ছিল, আমি বলতাছি এখন থেইকা ৫৬-৫৭ বছর আগের কথা- তখন সাবেক পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম চিড়িয়াখানা ছিল এখন যেখানে হাইকোর্ট আছে ওই জায়গাটায়। আর ওইখানে একটা বড় পুকুরের মতন ছিল, সেখানে ছোটবেলায় আমরা মাছ ধরতাম, গোসল করতাম। প্রচুর গাছগাছালি ছিল হাইকোর্ট এলাকায়। আসলে ঢাকায় আগে এতো গাছ ছিল যা এখন কল্পনার মতন। যখন অনেক ছোট ছিলাম তখন হাঁইটা হাঁইটা বন্ধুদের সাথে বিভিন্ন জায়গায় গেছি, কিছু কিছু স্মৃতি তো মনে আছে। আমাদের বাসার পেছন দিকে ছিল রেসকোর্সের ময়দান। আমার জানামতে তখন সপ্তাহে দুদিন রেস হইতো। রোববারে হইতো সেটা মনে আছে। বহুলোক দেখতে আসতো। যারা ঘোড়দৌড় করতো তাদের বিভিন্ন রঙের পোশাক ছিল। আমরা পিছনে দাঁড়াইয়া দেখতাম। কাঠের রেলিং দিয়া পুরা ময়দানটা ঘেরা থাকতো। সেই ময়দান এখন সোহরাওয়ার্দী উদ্যান। ব্রিটিশ আমলে নাকি এইখানে পোলো খেলা হইতো। আমার জীবনের প্রথম ঘোড়দৌড় আমি ওই মাঠেই দেখছি। বড় বড় রাজনৈতিক অনুষ্ঠান তখন পল্টন ময়দানেও হইতো রেসকোর্স ময়দানেও হইতো। ওই জায়গায় পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর আজম খানও কি একটা মিছিল করতে আসছিল। যাইহোক রেসকোর্স এলাকা, হাইকোর্ট এলাকায় প্রচুর পাখি ছিল। বানর ছিল, শিয়াল ছিল, সজারু ছিল। আমরা ছোটবেলায় সজারুর কাঁটা টোকাইতাম। অনেকটা বনাঞ্চলের মতোই ছিল। ৫৬, ৫৭, ৫৮ বছর আগে এরকম আরবান ঢাকা তো ছিল না। ঢাকা একটা মহকুমা শহরের মতই ছিল। হাইকোর্টে থাকতে প্রচুর পাখি দেখছি। ঝাউগাছ, ঝাউগাছের গর্তে টিয়াপাখি থাকতো। আরো বড় বড় লেজওয়ালা অনেক পাখি দেখছি। সেসব পাখি পরবর্তীকালে মানে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরে উধাও হইয়া গেছে। কারণ এতো লোকজন হইয়া গেছে বাংলাদেশে! গত ত্রিশ বছরে ঢাকা থেইকা গাছ হারাইছে, পাখিও হারাইছে। আমরাই এগুলারে হত্যা করছি। নিজের চোখের সামনে ঢাকা শহরটা বাইড়া উঠতে দেখছি। মতিঝিল এলাকা, ধানমন্ডি, গুলশান-বনানী সবই চোখের সামনে বাইড়া উঠছে। আমি যেইভাবে বাইড়া উঠছি আস্তে আস্তে, ঢাকার আরবানাইজেশনও একই সাথে বাইড়া উঠছে। রাজধানী যে বিকশিত হইতাছে তাও আমার চোখের সামনে হইছে।
প্রশ্ন : পড়াশোনা কোথায় করেছেন?
নাসির আলী মামুন : আমি প্রথমে পড়ছি হইলো আজিমপুর কিন্ডারগার্ডেন স্কুলে। তারপর কলাবাগানের একটি স্কুলে আসছি। তারপর কিছুদিন বাসায়ই ছিলাম। তারপর ধানমন্ডির মহামেডান স্কুল। শেষে ঢাকা কলেজে।
প্রশ্ন : আপনার পরিবার সম্পর্কে কিছু বলুন?
নাসির আলী মামুন : আমার স্ত্রী নাজমা। বিয়ে করছি ২৮ বছর হয়ে গেছে। নাজমা গৃহিনী। আমাদের পারিবারিক বিয়ে। প্রথমে দুজনের মধ্যে জানাশোনা ছিল। আমাদের দুছেলে। একজনের নাম অন্যতম, আরেকজন রেশাদ। রেশাদ পালিত পুত্র কিন্তু কখনো নিজের ছেলের চেয়ে কম মনে করি নাই। অন্যতম এবার অনার্স দিলো। ফটোগ্রাফিতে ওরে বেশি উৎসাহ দেই না, বাধাও দেই না। ওর যা ইচ্ছা ও হোক।
প্রশ্ন : ফটোগ্রাফি শিখেছেন? মানে কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির কাছ থেকে?
নাসির আলী মামুন : আমি কোনো জায়গায় ফটোগ্রাফির ট্রেনিং নেই নাই। কিন্তু একজনের কাছে শিখছি যে এক্কেবারে আনকোড়া ছিল। সে খুব ভালো জানতো তা না। কিন্তু ফটোগ্রাফির প্রতি তার আগ্রহ ছিল, কিছু ধারণা ছিল। সে আর কেউ না-আমি নিজেই নাসির আলী মামুন। আমার ছবি তোলার কোনো গুরু নাই। আমি নিজেই নিজের শিক্ষক। নিজের কাছে নিজে প্রশ্ন করতাম। নিজেই উত্তর দিতাম। দেখতাম সেই উত্তর সঠিক হয়ে গেছে। যেমন-অ্যাপারচার। আমি আন্দাজ করতাম এই আলোতে কত অ্যাপারচার দিলে সঠিক এক্সপোজার পাওয়া যাবে। পরে যখন ডেভলপ করতে যাইতাম দেখতাম আমার আন্দাজই ঠিক। অনেকের কাছে গিয়ে যে শিখি নাই তা না। দুএকটা সমস্যা দেখা দিছে, যেমন- শাটারস্পিড আসলে কি? তখন বলা হইতো-শাটারস্পিড মানে কত সময় নিয়া ক্যামেরার মধ্যে আলো ঢুকবে। এখন তো ডিজিটালের যুগে সেই প্রশ্নের বালাই নাই। এখন ক্যামেরায় টিপ দিলেই ছবি আসে। আমার মনে হয় না অ্যাপাচার শিখার জন্য এখন আর ফটোগ্রাফারকে সময় নষ্ট করার প্রয়োজন আছে। আমি যাদের কাছে কিছু কিছু বিষয় শিখতে যেতাম তারা বেশিরভাগই ছিল বিহারী। তারা ছিল স্টুডিওর ফটোগ্রাফার। কিভাবে ফিল্ম ডেভলপ করে, প্রিন্ট করে এগুলো তাদের কাছ থেকে জানছি। ’৬৯-’৭০ সালে মানে পাকিস্তানি আমলে ঢাকায় যে বিহারী ফটোগ্রাফাররা ছিল এবং বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরেও যারা কাজ করছে তাদের কাছ থেকে অনেক কিছু শিখেছি। পাকিস্তানি আমলে আমি ফটোগ্রাফার হই নাই, কিন্তু ক্যামেরা হাতে নিছি। এই বিহারী ফটোগ্রাফাররা ছিল ঢাকার মিরপুর, মোহাম্মদপুরের। বিহারীগো আস্তানাই তো ছিল এসব এলাকা। ওদের সাম্রাজ্য আরকি। তুমি তো জানোই ’৭১ সালে ওরা কি করছে! যাইহোক। ওরা ওইখান থেইকা আসতো কাজ করতে। গ্রিনরোড এলাকায় আমি থাকতাম। গ্রিনরোড এলাকায় ‘নেহার’ নামে একটি স্টুডিও ছিল। আমার জানা মতে, ’৬৪ সালে এই স্টুডিওটি প্রতিষ্ঠিত হয়। ওই এলাকার সবচেয়ে পুরনো স্টুডিও। যা এখন আর নাই। ওই স্টুডিওর বিহারী কর্মচারী যারা ডার্করুমে কাজ করতো তাদের কাছ থেইকাও অনেক কিছু শিখছি।
প্রশ্ন : কিভাবে ফটোগ্রাফি শুরু করলেন?
নাসির আলী মামুন : ১৯৬৭ সালে আমি প্রথম ক্যামেরা হাতে পাই। আমার এক বন্ধু ছিল, ঢাকার নবাববাড়ির নবাব সলিমুল্লাহ হইলো তার আপন নানা। সে এখনো জীবিত। গ্রিনরোডে থাকতো ওরা। তার নাম হইলো খাজা মোহাম্মদ হারিস আদিল। খাজা হারিসের কাছ থেইকা আমি প্রথম ক্যামেরা নেই। সে ফটোগ্রাফি জানতো না। তার বোন লন্ডন থেইকা অনেকগুলা খেলনার সাথে একটা ক্যামেরা পাঠায়। ক্যামেরার চোখ দিয়ে দেখার জন্য কোনো ভিউফাইন্ডার ছিল না। আন্দাজ কইরা ছবি তুলতে হইতো। শুধু ছবি তোলার একটা লেন্স ছিল। সেই প্লাস্টিকের ক্যামেরার মধ্যে যে ফিল্ম ভরতাম সে ফিল্ম থার্টি ফাইভ ও ওয়ান টুয়েন্টির মাঝামাঝি ফরম্যাটের ছিল। স্বাধীন বাংলাদেশে এই ফরম্যাটের ফিল্ম আমি আর পাই নাই। খেলনা ক্যামেরা, ছবি উঠতো একটু সফ্ট, আউট-অব-ফোকাস-তাতেই মহাখুশি। কি ছবি তুললাম? কোনো ল্যান্ডস্কেপ না। বাংলাদেশের যেকোনো আলোকচিত্রশিল্পী প্রথম ক্যামেরা হাতে পাইয়াই তাদের সামনের ল্যান্ডস্কেপ, ফুল, পাখির ছবি তোলে। আমি কিন্তু সেদিকে গেলাম না। এধরনের একটা ছবিও তুললাম না। আমি তুলছি আমার বন্ধু-বান্ধব, ভাই-বোনদের ছবি। পরে অবশ্যই হারিসের বোন ওর জন্য আরো একটি ক্যামেরা পাঠাইছিল। ওটার আবার ভিউফাইন্ডার ছিল। ক্যামেরার নাম ‘লুবিটেল’। যতদূর মনে পরে ক্যামেরাটি ১৯৬৮ সালে পাঠানো হয়েছিল। সেটা দিয়েও ছবি তুলেছি। সেটা ছিল ওয়ান টুয়েন্টি ফিল্ম ক্যামেরা। আমার অরেক বন্ধু আশফাক। ধানমন্ডির সরকারি স্কুলে আমরা একসাথে পড়তাম। আশফাকের ক্যামেরা দিয়েও আমি ’৬৮-’৬৯ সালে অনেক ছবি তুলছি। ওইটা ছিল থার্টি ফাইভ মিলিমিটারের ক্যানন ক্যামেরা। একটা ফিল্ম কিনলে ৭২টা ছবি নেয়া যেতো। তখন থেইকাই পোরট্রেটের প্রতি আগ্রহ ছিল। তখন কিন্তু জানতাম না পোরট্রেট ফটোগ্রাফি কি। ফটোগ্রাফার হবো সেই বাসনা মনে ছিল সত্য কথা। পরবর্তীকালে ’৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ যখন হইয়া গেল তখন সারা দেশেই একটা অস্থির অবস্থা বিরাজ করছিল। নতুন দেশ, নতুন জাতি, নতুন ভাষার মানুষ আমরা। আগে পাকিস্তানের অংশ ছিলাম। স্বাধীনতার পর হইলাম এক জাতি, এক দেশ, এক ভাষার মানুষ। তখন দেখলাম চারিদিকে কাজ করা শুরু হইয়া গেছে। তরুণরা কাজ করার রাস্তা খুঁজতাছে। তখন দেখলাম যে আমি যদি আমার রাস্তা এখন ঠিক না করি তাহলে বিভ্রান্ত হইয়া যাবো, কোনো কাজই করতে পারবো না। এখনই আমার বড় সুযোগ একটা কিছু করার। কিন্তু ফটোগ্রাফি ট্রেনিং আমার নাই। নিজের ক্যামেরাও নাই। তখন খোঁজ নেয়া শুরু করলাম কাদের কাছে ক্যামেরা আছে। তখন অল্প কিছু পরিবারে ক্যামেরা ছিল। আমাদের একটা কাব ছিল- নবারুণ কিশোর সংঘ। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়া পর্যন্ত সে কাব ছিল। এটি কোনো ফটোগ্রাফির কাব ছিল না। এটি ছিল খেলাধুলার কাব। আমি আজীবন কাবের ক্যাপ্টেন ছিলাম। অনেক বিহারী বন্ধুও এই কাবের সদস্য ছিল। ওরা ভালো ছিল, নিরীহ বিহারী আরকি। মুক্তিযুদ্ধের সময় ওরা সব চইলা গেল। স্বাধীনতার পর বন্ধুরা বিচ্ছিন্ন হইয়া গেলাম, গ্রিনরোড এলাকা ছাইড়া অনেকে অন্য জায়গায় চইলা গেল, আমরাও অন্য জায়গায় চইলা গেলাম- ফলে ক্লাব আর টিকলো না। ১৯৬৫ সালে কাবটা শুরু করছিলাম। আমাদের সঙ্গে তখন খেলছে মুক্তিযোদ্ধা আবদুল আজিজ। মুক্তিযুদ্ধের সময় সে ঢাকা সিটি কমান্ডার ছিল, তার আগে ঢাকা কলেজের ভিপি ছিল। আরো ছিলেন লেফটেনেন্ট বাবুল ভাই। তিনি মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হন। তারা গ্রিনরোড স্টাফ কোয়ার্টারে থাকতেন, আমাদের প্রতিবেশী ছিলেন। আরো অনেক মুক্তিযোদ্ধা বড়ভাই আমাদের কাবে খেলছেন। আমাদের অনেক উৎসাহ দিতেন। যাইহোক- আমি তখন ফটোগ্রাফার হতে ক্যামেরা খুঁজতে লাগলাম। বন্ধু আশফাকের কাছ থেইকা ক্যামেরা ধার নিতাম। আমার আরো বন্ধু-বান্ধব ছিল। খুব জটিল অবস্থা ছিল। অনেক বন্ধুর কাছ থেইকা ক্যামেরা নিতাম কিন্তু ক্যামেরার মালিক বন্ধু ছিল না। ক্যামেরার মালিক ছিল কারো কারো দাদা। এরকম একজনের কাছ থেইকা ক্যামেরা নিতাম- যার দাদা ছিল ক্যামেরার মালিক। ধানমন্ডিতে থাকতো। আমার স্কুল ফ্রেন্ড। তাদের ক্যামেরা আলমারিতে একটা লাল মখমলের কাপড়ে মোড়ানো থাকতো। ফক্টল্যান্ডার ক্যামেরা। অস্ট্রিয়ান ওয়ান টুয়েন্টি ক্যামেরা। ৮টা এক্সপোজার দিতো। সে ক্যামেরা দিয়া ফোকাস করা যাইতো না। দূরত্ব অনুযায়ী ফোকাস করতো। একটা ফিতা রাখতাম, ১ ফিট, ২ ফিট, ৩ ফিট। যার ছবি তুলতাম তার মুখ থেইকা ক্যামেরা লেন্স পর্যন্ত ফিতা দিয়ে মাপতাম। যত ফিট হইতো তত ফিট লেন্সের সামনের রিং ঘুরাইয়া সেট করে দিতে হইতো। এই ভাবে ধার করা ক্যামেরা দিয়া, এতো কষ্টের মইধ্যে আমি ছবি তুলতাম। অ্যাপারচার ব্যাপারটা আমি শিখছিলাম শুরু দিকেই। ক্যামেরা হাতে নেয়ার এক থেকে দেড় বছরের মধ্যে। অনেক ফটোগ্রাফার ৮-১০ বছরেও ম্যানুয়াল ক্যামেরার অ্যাপারচার জানতো না। তখন তো লাইট মিটার ছিল না। আমি নিজে নিজে বিভিন্ন পরিমাণ আলোয় ছবি তুলে তুলে প্র্যাকটিস করতাম। সাদা-কালো ফিল্ম ডেভলপ করে দেখতাম ৯৯ ভাগ সময়ে ছবি ঠিক আসতো।
প্রশ্ন : পোরট্রেটই কেন বেছে নিলেন এবং কিভাবেই বা তা করা শুরু করলেন?
নাসির আলী মামুন : ছবি তোলা শুরু করলাম। কিন্তু কি ধরনের ছবি তুলবো? আমি দেখলাম আমার আগের ও সমসাময়িক ফটোগ্রাফাররা প্রায় সবাই প্রকৃতিনির্ভর ছবি তোলে। কিন্তু কে নো একটা বিশেষ বিষয়ের প্রতি তাদের ফোকাস নাই। আমি ভাবলাম সবাই যেদিকে যায় সেদিকে আমি যাবো না। দেখলাম কি কি খালি আছে। দেখলাম পোরট্রেট ফটোগ্রাফি বাংলাদেশে নাই। তখন পোরট্রেট ফটোগ্রাফি বলতে বুঝতো স্টুডিওতে গিয়া ছবি তুইলা আসা। এটা যে একটা বিষয় হতে পারে সেটাও কেউ জানতো না। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম আমি পোরট্রেট তুলবো। কাদের? যারা বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিখ্যাত লোক। বিখ্যাত লোকদের প্রতি আমার ভালোবাসা ছিল। শুরু করলাম পোরট্রেট ফটোগ্রাফি। কিন্তু বিখ্যাত লোকদের ঠিকানা জানি না। তারওপর নাই ট্রেনিং। বাংলা একাডেমীতে গেলাম ওরা একটা ছোট তালিকা করে দিলো। যেই বিখ্যাত মানুষের কাছে যাই তার কাছ থেইকাও বিখ্যাত মানুষের নাম চাই। কেউ কেউ দিলো, কেউ কেউ উপহাস করলো। আবার কেউ আমার তালিকা দেইখা বলে “আরে! আমি ছবি তুলবো না। তোমার তালিকায় অমুক লোকের নাম আছে। তুমি এর ছবি তুলছো?” যদি বলতাম, “হ্যাঁ তুলছি।” তখন হয়তো বলতো- “না, আমি ছবি তুলবো না, আমি তো এর দুই বছর আগে থেকে কবিতা লিখি। তুমি তার ছবি আগে তুলছো, আমারটা পরে তুলতাছো!” আবার অনেকে বলতো, “আরে! এতো ছাগল। তুমি এর ছবি তুলছো!” যাইহোক এরকম করতে করতেই ৫-৬ বছরে আমার প্রায় ৫শ ব্যক্তির একটা তালিকা দাঁড়াইলো। ৬৬জন কবি-সাহিত্যিকের পোরট্রেট নিয়া ১৯৭৭ সালে আমি প্রথম প্রদর্শনী করলাম, বাংলা একাডেমীর বইমেলায়। ছবির সাইজ ছিল ১০/১২-এর অর্ধেক। তখন তো অন্য কোনো কাজ করি না। বিশিষ্ট বেকার। সেসময় ছবি কেউ বুঝেও না, কেউ কিনেও না। পোরট্রেট যে শিল্প হতে পারে তা লেখকরাও বুঝতো না। প্রদর্শনীর আয়োজকও ছিল বাংলা একাডেমী। উদ্বোধন করছিলেন প্রেসিডেন্ট জিয়াইর রহমানের তথ্য উপদেষ্টা আকবর কবীর। তখন তো সামরিক শাসন। ফরিদপুরের আকবর কবীর ছিলেন ভারতের শিক্ষামন্ত্রী ও কবি হুমায়ুন কবীরের আপন ছোট ভাই। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কবি শামসুর রাহমান। শামসুর রাহমান প্রদর্শনী উদ্বোধনের দিনই অর্থাৎ ১৬ই ফেব্রুয়ারি দৈনিক বাংলার সম্পাদক হইছিলেন। আরো ছিলেন বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক ফোকলোর গবেষক ড. আশরাফ সিদ্দিকী। প্রদর্শনী চললো- ১৬ ফেব্রুয়ারি থেইকা ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। প্রদর্শনী দেখতে বহুলোক আসছে। কবি আহসান হাবীব, শামসুর রাহমান প্রথম দিনই দেইখা গেছে, রাজশাহী থেইকা কবি বন্দে আলী মিয়া আসছিল। বাংলা একাডেমী ভবনের চতুর্থ তলায় প্রদর্শনীর আয়োজন করা হইছিল। ছবিগুলো ছিল বোর্ডে লাগানো। কবি সুফিয়া কামাল আসছিলেন কিন্তু উপরে উঠতে পারছিলেন না, কারণ ওনার হার্টে সমস্যা ছিল। কবি আবদুস সাত্তার সুফিয়া কামালকে কোলে করে প্রদর্শনী দেখতে নিয়া গেলেন। আর হাল আমলের প্রায় সবাই আসছিলেন- কবি বেনজীর আহমেদ, কবি মঈনুদ্দীন, অসীম সাহা, মহাদেব সাহা, রফিক আজাদ, আসাদ চৌধুরী, সেলিনা হোসেন এরা সবাই আসছিলেন। প্রবীণ সাহিত্যিকরা খুব অ্যাপ্রেশিয়েট করছে, কিন্তু নবীনদের অনেকে অসন্তুষ্ট হইছিল যেহেতু প্রদর্শনীতের তাদের ছবি ছিল না। রফিক আজাদ ভাই মন্তব্য খাতায় লিখছিল- “অনেক ছবি দেখলাম, ভালো লাগলো। কিন্তু বেশিরভাগ ছবিই মৃত-মুমূর্ষুদের।” ভালো লিখছে, আমি খুব এনজয় করি। যাইহোক, এই প্রথম প্রদর্শনী হইলো। পোরট্রেট ফটোগ্রাফিতে মন দিলাম। তখন পেশা না। পয়সা আয় করলেই না পেশা। তখন নেশাই।
প্রশ্ন : ফটোগ্রাফিই করবেন এমনটি মনে হলো কেন?
নাসির আলী মামুন : আমি ফটোগ্রাফিটাকে বেছে নিছি কারণ আমার মনে হইছিল আমি অন্য কিছু হইতে পারবো না। আমার চেহারা ভালো না যে অভিনয় করবো, গলা ভালো না যে আবৃত্তি করবো। চেষ্টা করলে ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার নিশ্চয় পারতাম, আমি উদ্যোমী লোক, মেধাবী লোক। হই নাই,কারণ আমি এমন একটা দিকে যাইতে চাইছি যেদিকে নতুন কিছু করা সম্ভব। দেখলাম- আমি যদি আলোকচিত্রী হই তাহলে বাংলাদেশে পোরট্রেট ফটোগ্রাফির সূচনা করতে পারবো। ১৯৭২ সালে সূচনা আমি করছি। আমার হাত দিয়া পোরট্রেট ফটোগ্রাফি জন্ম হইছে এই দেশে। তার আগে কেউ করে নাই? পোরট্রেটকে ব্যতিক্রম মনে কইরা কেউ করে নাই। কিন্তু শিল্পকলার বিষয় হিসেবে প্রথম আমি পোরট্রেট ফটোগ্রাফি চালু করছি এই দেশে।
প্রশ্ন : একজন ফটোগ্রাফার হিসেবে ফটোগ্রাফিকে কিভাবে ব্যাখ্যা করেন?
নাসির আলী মামুন : ফটোগ্রাফি ওই মানুষরা করে যারা পৃথিবীর সবচেয়ে বুদ্ধিমান মানুষ। আমি বলছি না আলোকচিত্রীরা সবার উপরে, কিন্তু অন্যান্য শিল্পীদের তুলনায় আলোকচিত্রশিল্পীরা বেশি বুদ্ধিমান। তারা চৌকষ ও মেধাবী। আমরা কি দিয়া ছবি তুলি? ক্যামেরা নামক যন্ত্রের মাধ্যমে ছবি তুলি। আমরা এই যন্ত্রটারে কলম বানাই, পেন্সিল বানাই, তুলিও বানাই। আবার হারমোনিয়াম বানাই, সেতার বানাই, ভায়োলিন বানাই, বাঁশিও বানাই। এই ক্যামেরাটার ওপরে আমরা ভরসা করি না। ক্যামেরার সাথে আমরা এমন এক প্রেমের সম্পর্ক স্থাপন করি, যে সম্পর্ক প্রেমিক-প্রেমিকার মধ্যে হয়Ñ সে সম্পর্কই একজন প্রকৃত আলোকচিত্রশিল্পী ক্যামেরার সাথে স্থাপন করে। করে বইলাইতো আলোকচিত্রী ক্যামেরা দিয়া এমন সব ছবি তোলে সেগুলো জাদুঘরে স্থান পায়। পশ্চিমা দেশগুলোর জাদুঘরে চিত্রকর্মের পাশাপাশি আলোকচিত্রও রাখা হয়। কি অসাধারণ সব ছবি! পিকাসে-মার্তিস-ব্রাকের চিত্রকর্মের সাথে আলোকচিত্রকর্ম কেন রাখছে তারা? কারণ তারা মনে করে উভয়ই শিল্প। আমাদের দেশের মানুষ যথেষ্ট শিক্ষিত না। কাজেই এদেশে আলোকচিত্রকলা তেমন বিকশিত হয় নাই এবং আদর্শশিল্প হিসাবে দাঁড়াইতে পারে নাই। আলোকচিত্রীরা অনেক বড়। সে একটা যন্ত্ররে ভাইঙা তুলি বানাইতাছো, কলম বানাইতাছো- এইটা সোজা কথা না। একটা ধাতব জিনিসকে কিভাবে তরল করে ফেলতাছে! এই কাজটা কারা করতে পারে? যারা অনেক বড় বিজ্ঞানী, বড় চিন্তাবিদ, বিরাট মেধাবী। আমরা আলোকচিত্রশিল্পীরা সেই শ্রেণীর মানুষ। আমাদেরকে সেভাবে কি মূল্যায়ন করা হয়? পশ্চিমা দেশে করা হয়। আর বাংলাদেশে করা হয় অবমূল্যায়ন। যে দেশে মুড়ি আর মুড়কির একই দাম সে দেশে আর কি আশা করবা? ১৬ কোটি মানুষের মধ্যে কত লোক শিক্ষিত? তুমি বলবা- পরিসংখ্যান তো বলে ৬৫ শতাংশ মানুষ শিক্ষিত। ১শ’র মধ্যে ৬৫জন স্বাক্ষর করতে পারে। আমার তো মনে হয়- যারা একটু-আধটু পড়তে পারে, একলাইন লিখতে পারে তাদের সংখ্যা ২০ শতাংশের বেশি না। রুচিশীল না বইলা এই মানুষগুলোকে দোষও দেই না। তারা রুচিশীল না, কারণ তারা দরিদ্র ও শিক্ষিত না। ফলে তারা স্বপ্নও দেখতে পারে না। কিন্তু এদেশের শিক্ষিত শ্রেণীকে দোষ দিই। এরা ছবি আঁকে, গান করে, শিক্ষক, মিডিয়াকর্মী- কিন্তু আলোকচিত্রশিল্পীদের বাঁদিকে রাখে। তারা আলোকচিত্রশিল্পীকে ‘কামলা’ মনে করে। ঢাকার একটা দৈনিক পত্রিকার সম্পাদক আমার সামনেই ফটোসাংবাদিকদের কামলা বলতো। তারা নাকি কামলাগিরি করে। শব্দটা অশ্লীল। এভাবে আলোকচিত্রীদের ছোট করা হয়। এই দেশে ফটোগ্রাফি করা মানে ধারালো কিছু দিয়া নিজের শরীর কাইটা রক্ত ঝরানো। তাই আমি করতাছি, আমরা করতাছি। আনন্দের সাথে করতাছি।
প্রশ্ন : পোরট্রেট ফটোগ্রাফিকে কিভাবে ব্যাখ্যা করেন?
নাসির আলী মামুন : ফটোগ্রাফির শত শত বিভাগ আছে। তারমধ্যে পোরট্রেট ফটোগ্রাফি সবচেয়ে উচ্চ শিখরে অবস্থা করছে। এভারেস্টে পোরট্রেট ফটোগ্রাফি বইসা আছে। কারণ ফটোগ্রাফির নির্যাস হইলো পোরট্রেট ফটোগ্রাফি। যারা পোরট্রেট ফটোগ্রাফার তারা সবচেয়ে বুদ্ধিমান, সবচেয়ে মেধাবী। কারণ তারা যাদের ছবি তোলে তাদের ব্যক্তিত্ব, চরিত্র এবং তাদের প্রাণটা ছবির মধ্যে তুইলা ধরে। অনেক পোরট্রেট ফটোগ্রাফার আছে যাদের তোলা ছবি দেখলে মনে হবে, মডেলের চোখ নড়তাছে, কথা বলতাছে, সে শব্দ করতাছে, গান করতাছে, কবিতা আবৃত্তি করতাছে- এইখানেই ফটোগ্রাফারের মুনশিয়ানা। ওই প্রাণ যে দিতে পারে সে কত বড় বুদ্ধিমান!
প্রশ্ন : মামুন ভাই, আপনার ফটোগ্রাফি করার পেছনে কোনো অনুপ্রেরণা কাজ করেনি?
নাসির আলী মামুন : অনুপ্রেরণা পাইছি। অনুপ্রেরণা ছাড়া কিভাবে হবে? প্রথমে অনুপ্রেরণা পাইছি পত্র-পত্রিকায় ছাপা হওয়া বিখ্যাত লোকদের ছবি দেইখা। তখন আমি ফটোগ্রাফির কোনো বই দেখি নাই। এগুলো কোথায় পাওয়া যায়, ব্রিটিশ কাউন্সিল কোথায়- এসব কিছুই জানতাম না। পরে আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে এগুলো আমি জানছি, বই দেখছি। সেসময় ব্রিটিশ কাউন্সিলের লাইব্রেরিতে কিছু বই দেখছি। পরিচিতদের বাসায় গিয়া বই পাইছি। ফটোগ্রাফিক ম্যাগাজিন দেখছি। ততদিনে আমার নিজস্ব স্টাইল গ্রো করছে। গ্যাটে ইনস্টিটিউটে কিছু জার্মান বই দেখছি।
প্রশ্ন : শুধু তো বাংলাদেশের বিখ্যাত ব্যক্তিদের ছবিই তোলেননি? আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বহু ব্যক্তির ছবি...
নাসির আলী মামুন : ’৬৩-’৬৪ সাল থেইকা আমি বিদেশি বিভিন্ন পত্রিকা থেইকা ছবি কাটতাম। সেসব খবরের কাগজে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, সাহিত্যিক ও অন্যান্য বিখ্যাত লোকদের যেসব ছবি ছাপা হইতো আমি সেগুলো দেখতাম। আর আমি আফসোস করতাম- এধরনের ছবি আমি নিজে কোনোদিন কি তুলতে পারবো না? কারা এসব ছবি তোলে? নিশ্চয় কোনো ফটোগ্রাফার? সে ক্যামেরা নিয়ে কিভাবে এই বিখ্যাত লোকের সামনে গেছে? কিভাবে তার সাথে কথা বলছে? আমাদের বাসায় ইংরেজি খবরের কাগজ আসতো। মর্নিং নিউজ আর অবজারভার। অবজারভারের একটা ট্যাবলয়েড সাইজের ম্যাগাজিন বের হইতো- সানডে। ওই ম্যাগাজিনের কভারে অসাধারণ সব পোরট্রেট ছাপা হইতো। আমানুল হকের ছবি দেখতাম, নাইব উদ্দিন আহমেদের ছবি দেখতাম, ড. নওয়াজেশ আহমেদের ছবি দেখতাম। তাদের ছবি দেইখা বিস্মিত হইতাম- এরা বাংলাদেশের ফটোগ্রাফার! তাদেরকে তখন চিনতাম না। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরে এদের আমি ভক্ত হইয়া যাই। তাদের সাথে আত্মিক সম্পর্ক হয়। খুব ভালো সম্পর্ক হয় তাদের সাথে। খবরের কাগজের পাতা থেইকা আমি বিখ্যাত লোকদের ছবি কাইটা রাখতাম। আব্বা পত্রিকা পড়ার আগেই আমি কাইটা ফেলতাম। এইজন্য মাইরও খাইছি। বিখ্যাত লোকদের ছবি আমি কাটতাম, কারণ বিখ্যাতদের প্রতি আমার দুর্বলতা ছিল। তাদের কাজকর্ম দেখে, তাদের লেখা পড়ে, তাদের কথা শুনে, তাদের ছবি দেখে তাদের প্রতি আগ্রহ জন্মায়। তখন পাকিস্তানি সরকারি টিভি ছাড়া আর কোনো টেলিভিশন ছিল না। অনেক অভিনেতা-অভিনেত্রী যাদের দেখে ভালো লাগতো তাদের অনেকের সাথে পরে দেখা হয়েছে। তাদের মধ্যে একজনের সাথে ২০০৯-এ দেখা হয়, আমি তার ভীষণ ভক্ত ছিলাম। বলাকা সিনেমা হলে তার ছবি দেখতে গেছিলাম। তার নাম সিডনি পয়েটিয়ার। উনি কৃষ্ণাঙ্গ। তিনি প্রথম ব্ল্যাক যিনি ১৯৬৩ সালে অস্কার অর্জন করেন। ২০০৯ সালে তার বয়স প্রায় ৮০। হোয়াইট হাউসে তার সাথে আমার দেখা হয়। ইউনূস স্যারের সাথে আমি গেছিলাম। আমেরিকার সর্বোচ্চ বেসামরিক খেতাব ‘প্রেসিডেন্সিয়াল মেডেল অব ফ্রিডম’ গ্রহণ করতে ইউনূস স্যার গেছিলেন। সেই মেডেল প্রদান অনুষ্ঠানে আমার সাথে সিডনি পয়েটিয়ার আর স্টিফেন হকিংসের দেখা হয়। সিডনি পয়েটিয়ারের কথা বললাম কারণ- এই অভিনেতাকে একসময় স্বপ্নে দেখতাম। এতো ভালো অভিনয় করতো। অবজারভারে ঔপন্যাসিক নরম্যান মেইলারের ছবি দেখছি। আমেরিকায় তার সাথে আমার কয়েকবার দেখা হইছে। দুইবার আমি তার পোরট্রেটও তুলছি। এরকম অনেকে আছে- কবি অ্যালেন গিন্সবার্গ। পত্রিকায় তার ছবি দেখছি। পরে ৫ বছর তার সাথে আমেরিকায় মিশা আসছি। ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। তিনি নিজে স্বীকার করতেন- আমি তার বন্ধু ছিলাম। কবি নির্মলেন্দু গুণের সাথে গিন্সবার্গের দুদফায় কয়েকবার দেখা হইছে, গুণদা’ দেইখা আসছে আমাদের মধ্যে কি নিবিড় সম্পর্ক ছিল। গিন্সবার্গের কল্যাণে অনেক লেখকের ছবি তোলার সুযোগ পাইছি। আমি প্রায় ৩৫জন নোবেল বিজয়ীর ছবি তুলছি। অস্কার বিজয়ী দুজন অভিনয় শিল্পীর ছবি তুলছি। অভিনেত্রী শ্যারন স্টোন, অভিনেতা হিউ জ্যাকম্যান, ১৪ বার গ্রামি অ্যাওয়ার্ড বিজয়ী কণ্ঠশিল্পী অ্যালিসিয়া কিস, রাজনীতিবিদ মিখাইল গর্বাচেভ, নোবেলজয়ী রাজনীতিবিদ লেস ওয়ালেসা, বিজ্ঞানী ডি. কার্ক, নোবেলজয়ী কবি ডেরেক ওয়ালকট ও অক্টোভিও পাজ, আরেক নোবলেজয়ী সাহিত্যিক গুন্টার গ্রাসসহ আরো অনেকের ছবি আমি তুলছি। গুন্টার গ্রাস তো ঢাকা আসছিল। ২০০৫ সালে কলকাতায় আসছিল, তার শেষ ভারত সফর। তখন আমি কলকাতায় ১০ দিন ছিলাম। তিনি যতদিন ছিলেন আরকি। তার পোরট্রেট করছি, তার সাথে সব অনুষ্ঠানে গেছি।
প্রশ্ন : গুন্টার গ্রাসের ঢাকা সফর নিয়ে আপনার অভিজ্ঞতার কথা বলুন?
নাসির আলী মামুন : ১৯৮৬ সালে গোপনে খবর পাইলাম গুন্টার গ্রাস ঢাকা আসবে। সম্ভবত বাইরের মানুষ হিসেবে একমাত্র আমিই জানতাম তিনি আসছেন। গ্যাটে ইনস্টিটিউটের পরিচালক গ্রাসের গাইড হিসেবে কবি বেলাল চৌধুরীকে ঠিক করলেন। বেলাল ভাই প্রস্তাব করলেন, গুন্টার গ্রাসের ঢাকা সফর স্মরণীয় করে রাখা হোক। কিভাবে? বললেন, একমাত্র একজন লোকই আছেÑ নাসির আলী মামুন, যে ক্যামেরাবন্দি করে রাখতে পারে এই সফরটি। বেলাল ভাই খবর দিলেন আমাকে, “আমার সাথে থাকবা তুমি, গ্রাস আসতাছে।” আমরা কাউরে জানাইলাম না। গুন্টার গ্রাসও জানাইতে চাইতেন না। প্রেস তিনি একদম পছন্দ করতে না। গুন্টার গ্রাস ৭দিন ছিলেন। দুএক জায়গা ছাড়া তার সাথে প্রায় সব জায়গায় গেছি। তারপর গুন্টার গ্রাসের ওপর আমার বই বাইর হইলো। আগামী প্রকাশনী বাইর করছে, ‘গুন্টার গ্রাসের ঢাকা আবিষ্কার’। ওই বই আমি গ্রাসকে পাঠাইছিলাম। পরে জানছি- সে বইটা পায় নাই। কিন্তু কলকাতায় যখন নিয়া গেছি তখন গ্রাস দেইখা অবাক হইয়া গেছে, “এইসব ছবি তুমি এখনো রাখছো!” আমি কইলাম, “হ্যাঁ, যতœ কইরাই রাখছি।” বললো, “একটা কপি আমারে দেও।” আমি একটা কপিই নিয়া গেছিলাম, ভাবছি বইটায় গ্রাসের অটোগ্রাফ নিবো। বইটাতে তিনি অটোগ্রাফ করলেন ঠিকই। তারপর বললেন, “আমাকে এক কপি পাঠাবা।” পরে ভাবলাম- বইটা দিয়াই দিই। শেষে সেখানকার জার্মান কালচারাল সেন্টারের পরিচালকের হাতে বইটা দিয়া দিলাম। কিন্তু পরিচালক আর গ্রাসকে বইটা দেয় নাই। পরে আমি আবার গুন্টার গ্রাসকে বইটা পাঠাইলাম। এইতো ২০১০-এ প্রকাশক রবীন হাসান ফ্যাঙ্কফুট বইমেলায় গেছিল। আমি বইটা রবীন হাসানকে দিলাম। সে গুন্টার গ্রাসের হাতে বইটি দিয়া আসছে। অনেক লোকের মাঝখানে গুন্টার গ্রাস এবং তার স্ত্রী নাকি বইটার পাতা উল্টাইয়া দেখছিল। ২০০৫ সালে গ্রাস যখন কলকাতায় গেল, তখন তার প্রত্যেকটা অনুষ্ঠানের ছবি তুলছি অত্যন্ত প্রতিবন্ধকতার মধ্যে। আমি বাংলাদেশ থেইকা গেছি সবাই জানে। গ্রাসের আশেপাশে সাঙ্গপাঙ্গ জমে গেছিল- কলকাতার কয়েকজন সাংবাদিক, একজন আর্টিস্ট, কলকাতার জার্মান কালচারাল সেন্টারের পরিচালক। তারা চায় নাই বাংলাদেশের কেউ ছবি তুলে বই করে ফেলুক। প্রত্যেকটা জায়গায় ওরা আমারে বাধা দিছে। ড. মার্টিন ক্যাম্পসেন নামে এক ভদ্রলোক আছেন। শান্তি নিকেতনে ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে আছেন। বাংলা জানেন। উনি রবীন্দ্রনাথের ওপর জার্মান ভাষায় বই করছেন। এই ভদ্রলোক একজন জার্মান হইয়াও আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হইলেন দেইখা আমি বিস্মিত। সে বাঙালি কায়দায় ভলেন্টিয়ার দিয়া আমারে অনুষ্ঠান থেইকা বাইর কইরা দিতো। কলকাতার সাংবাদিকরা ছবি তুলতাছে, আমি বললাম, “আমারে ছবি তুলতে দিবা না ক্যান? আমার তো আজকের অনুষ্ঠানের কার্ড আছে।” তখন জিজ্ঞাসা করে, “তুমি কি প্রেসের?” আমি কোনো সময় বলছি ‘প্রেসের’, কোনো সময় ‘প্রেসের না’ বলছি। কিন্তু যখন বলি, ‘প্রেসের’ তখন বলে, “আজকে প্রেস অ্যালাউড না।” যখন বলছি, ‘প্রেসের না’ তখন বলতো, “আজকে শুধু প্রেসের জন্য।” আমি দেখি, কলকাতার ফটোসাংবাদিকরা কার্ড ছাড়াই ছবি তুলতাছে। আমি দেখছি, ওই ক্যাম্পসেন চোখের ইশারায় আমার বিরুদ্ধে কাজগুলো করতো। আমি এগুলো দেইখাই বড় হইছি। বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশিষ্ট মানুষ, বুদ্ধিজীবীদের ষড়যন্ত্র এবং তাদের চোখ দিয়া কথা বলার ভাষা আমি বুঝি। এদের সাথে তো আমি ৪০ বছর ধইরা মিশতাছি। কলকাতা যাওয়ার আগে ড. ক্যাম্পসেনরে আমি ইমেইল করছিলাম, গুন্টার গ্রাস যে আসতাছে সে জানে কিনা। সে উত্তর দিলো, না আমি কিছুই জানি না। আমি গ্রাসের ইমেইল ঠিকানা, বাড়ির ঠিকানা এবং ফোন নম্বর চাইলাম। বললো, গ্রাসের সাথে তার নাকি কোনো যোগাযোগই নাই। তার কয়েকদিন পর ইন্টারনেটে সার্চ কইরা দেখি- সে গ্রাসের বাড়িতে গেছে, সাক্ষাৎকার নিছে, সেই সাক্ষৎকার ছাপাও হইছে। তার এই পুরা ষড়যন্ত্রের সাক্ষী হইলো কবি অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত। তিনি দীর্ঘকাল জার্মানিতে ছিলেন, গ্রাসের বন্ধু। তখন তাকে বারবার গিয়ে বলছি, দাদা দেখেন আমার সাথে কি আচরণ করতাছে। তিনি আমার প্রতি যথেষ্ট সহানুভূতি দেখাইছেন। জার্মান কালচালার সেন্টারের পরিচালককে পর্যন্ত তিনি ফোন করছেন, বলছেন, “গুন্টার গ্রাসের ওপর ওর বই আছে। ও আমাদের মেহমান, বাংলাদেশের নামকরা ফটোগ্রাফার। তোমরা কেন ওর সাথে এমন করতাছো?” পরিচালক কোনো সদুত্তর দিতে পারে নাই। এমনকি গ্রাসের সামনে আমারে কয়েকবার বাইর কইরা দিছে। গ্রাস দেখছে, কিচ্ছু বলে নাই।
প্রশ্ন : আপনি মাদার তেরেসারও অসাধারণ কিছু পোরট্রেট তুলেছেন? সেই অভিজ্ঞাতার কথা বলুন?
নাসির আলী মামুন : ১৯৮১ সালের জানুয়ারি মাসে মাদার তেরেসা ঢাকায় আসলো। তেজগাঁওয়ের একটা চার্চে উঠলেন। আমি খবর পাইলাম ওই চার্চ থেইকা অতোটা বাজে তিনি পুরান ঢাকায় যাবেন। সকালে চইলা গেলাম তেজগাঁও চার্চে। মাদার তেরেসা চার্চের ভিতরে, আমাকে ভিতরে ঢুকতে দিতাছে না। আমার সাথে ওয়ান টুয়েন্টি ইয়াশিকা ক্যামেরা। থার্টি ফাইভ মিলিমিটারের কোনো ক্যামেরা আমার তখন ছিল না। আমি অনেক অনুরোধ করলাম, তারপরও আমাকে চার্চের ভিতরে ঢুকতে দিলো না। কয়েকজন নান কিছুক্ষণ পরপর দরজা দিয়া উঁকি দিয়া চইলা যায়। দেখে বাইরে কেউ আছে কিনা। আমি একটু আড়ালে গেলাম। এর কিছুক্ষণপর দেখলাম মাদার তেরেসা ৩জন নানসহ দ্রুতপায়ে বাইর হইয়া আসলেন। তিনি যত দ্রুত হাঁটতাছিলেন তত দ্রুত আমিও হাঁটতে পারতাম না। নোবেলজয়ী তেরেসা একটা মাইক্রো বাসের কাছে চইলা গেলেন। আমি কাছে গিয়া মাদার তেরেসাকে অনুরোধ করলাম একটু সময় দিতে। তিনি মানতাছিলেন না। আমি মাইক্রো বাসের দরজা রোধ কইরা দাঁড়াইলাম। বললাম, “যেভাবেই হোক আমাকে একটু সময় দিতেই হবে।” মাদার তেরেসার ছবি তুলতে আমাকে কিন্তু কেউ বলেনি। মাদার তেরেসার ছবি তুলতে হবে এই চিন্তা থেকেই আমি গেছিলাম। যাইহোক, আমার সঙ্গে ছিলেন দৈনিক ইত্তেফাক-এর সিনিয়র করসপন্ডেন্ট নাজিমুদ্দিন মোস্তান সাহেব। তিনি মাদার তেরেসার সঙ্গে তর্ক শুরু কইরা দিলেন। আমি করতেছি অনুরোধ। মোস্তান সাহেব বললেন, “আপনাদের মিশনারি ও চ্যারিটির কাজ বিভিন্ন দেশে বন্ধ করে দেয়া হইছে, পশ্চিমবঙ্গেও আপনাদের কাজকর্ম নিয়া বিতর্ক আছে...আমার কাছে সেসব রিপোর্ট আছে।” এসব কথা শুনে মাদার তেরেসা উত্তেজিত হইয়া গেলেন। পরে বললেন, “চলে,া ভিতরে চলো।” মাদার তেরেসার সাথে আমি আর মোস্তান সাহেব চার্চের ভিতরে ঢুকলাম। একটা স্কুলঘরের মতো রুম। ওইদিন স্কুল ছুটি ছিল। ঘরের বেঞ্চে আমরা বসলাম। ঘর প্রায় অন্ধকার। তবে বড় বড় জানালা আছে। মোস্তান সাহেব মাদার তেরেসার সাক্ষাৎকার নিতে চাইলো, তেরেসা বললেন. “৫ মিনিটে শেষ করো।” আরো বললেন, “তোমরা সঠিক আচরণ করো নাই, আমাকে বাধা দেয়া ঠিক হয় নাই। জানো, কত শিশু আমার সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে?” মাদার তেরেসা তখন যাইতাছিলেন পুরান ঢাকার একটা এতিমখানায়। আমরা দুজনেই তার কাছে ক্ষমা চাইলাম। যাইহোক মোস্তান সাহেব সাক্ষাৎকার নিলেন, পরেরদিন সে সাক্ষাৎকার ইত্তেফাক-এ ছাপাও হইছিল। আলো কম, বেঞ্চের ওপর ক্যামেরা রাইখা খুব স্লো শাটারস্পিডে আমি ছবি তুললাম। বেশিরভাগ ছবিই ব্লার আসছে। প্রায় দেড় রোল শেষ করলাম। মনে বললাম, ক্ষমা চাইছি ঠিকই, কিন্তু যে প্রত্যাশা ও উদ্দেশ্য নিয়া আসছিলাম সে চাওয়া সফল হইছে। মাদার তেরেসা ঢাকায় ছিলেন মাত্র ৩দিন। তিনি যেখানে যেখানে গেছেন সেখানেই হাজির হইছি। কাকরাইলের চার্চ মাদার তেরেসাকে সম্বর্ধনা দেয়, তখনও ছবি তুলছি। পরেরদিন ছবি প্রিন্ট কইরা সে ছবিতে মাদার তেরেসার অটোগ্রাফও নিছি। কিন্তু তাকে ছবি দেয়া হয় নাই।
প্রশ্ন : একজন পোরট্রেট মডেলের মুখ আপনি কি খোঁজেন?
নাসির আলী মামুন : তার মুখে আমি অনেক অক্ষর দেখি। সেই অক্ষর দিয়া আমি যুৎসই বাক্য রচনা করি। আলো-ছায়ার খেলা করি। আমি আমার মডেলকে আবিষ্কার করার চেষ্টা করি। এমন হতে হবে, তোমার ছবি তুললে যাতে আমার মতো না দেখায়, আবার আমার ছবি তুমি তুললে যাতে মনে না হয় আরেকজনের ছবি। প্রত্যেক ব্যক্তির চেহারা, ঠিকানা, চিহ্ন তো আলাদা থাকে। একজন ব্যক্তির মধ্যে আরেকটি জিনিস থাকে তা হলো ব্যক্তিত্ব। সে বিখ্যাত লোক না হলেও তার নিজস্ব ব্যক্তিত্ব থাকে। সেই ব্যক্তিত্ব ছবির মধ্যে আসছে কিনা সেদিকে লক্ষ্য রাখি। আরো প্রক্রিয়া আছে, তার সাথে ব্যক্তিগত সম্পর্ক স্থাপন, তার সাথে গল্প করা, তাকে স্টাডি করা- এই আরকি।
প্রশ্ন : আপনার অভিজ্ঞতার ঝুলি পরিপূর্ণ। কোনো একটি স্মরণীয় ঘটনার কথা কি মনে পড়ে?
নাসির আলী মামুন : জীবনে অনেক স্মরণীয় ঘটনা ঘটছে। আমি যাদের ছবি তুলছি তারা তো সবাই জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতিমান লোক। এদের জীবনে গল্প থাকে। এদের প্রতি মানুষের কৌতূহল থাকে- এরা কি খায়? কিভাবে জীবনযাপন করে? আমারও কৌতূহল ছিল। যেমন- অ্যালেন গিন্সবার্গের বাসার ভিতরটা কি রকম আমি দেখছি। তার বাড়িতে আমি গেছি। এস এম সুলতানের ডেরাটা কেমন ছিল আমি জানি। তার সাথে থাকছি। সাধারণ মানুষ জানে না, তারা বিখ্যাত ব্যক্তির ইমেটিশন দিকটা দেখে। কিন্তু আমি ঘরের ভিতরে বিখ্যাতদের ‘র’ অবস্থায় দেখছি। নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সাথে বহুদেশ ঘুরছি। ২০০৮ সালে ইতালিতে যাইয়া একটা ঘটনা দেখলাম। একটা ফাইভ স্টার হোটেলে আমরা পাশাপাশি রুমে ছিলাম। তার সঙ্গে আমি ছাড়া কেউ নাই। এমন অবস্থায় আমি তখন শুধু তার ব্যক্তিগত ফটোগ্রাফারই না, ব্যক্তিগত সহকারীও হইয়া যাই। অঘোষিতভাবে আমি তার পার্সোনাল সেক্রেটারিও হইয়া যাই। মানে ১৯৭৮ সাল থেইকা ওই ধরনের একটা সম্পর্ক তার সাথে আমার তৈরি হইছে। তার অনেক কাজ কর্ম আমি করি। তাকে অ্যাসিস্ট করার চেষ্টা করি। সে চায় না, কিন্তু আমি করি। তিনি আমাকে পছন্দও করে, বিশ্বাসও করে। যাইহোক, তার রুমে হঠাৎ ঢুইকা গেছি। দেখি উনি কাপড় ইস্তিরি করতাছেন। এই দৃশ্য কোনোদিন দেখি নাই। ইতালির বিরাট এক অনুষ্ঠানের তিনি তখন প্রধান বক্তা। সেই লোক নিজে কাপড় ইস্তিরি করতাছে! আমি কিন্তু পাশের রুমেই। আমাকে অথবা হোটেলের কাউকে বলতে পারতো। আমি গিয়া বললাম, স্যার আমাকে দেন আমি করি। বললো, “না-না মামুন, তুমি ওই সোফায় বইসা আরাম করো।” এরকম বড় মাপের মানুষ উনি। নোবেল বিজয়ী একজন মানুষ, যিনি পৃথিবীর বড় বড় পুরস্কার অর্জন করছেন, এই উপমহাদেশে তার পর্যায়ের আর একটা লোকও নাই এবং এতো আন্তর্জাতিক পুরস্কার আর কেউ পায় নাই- তার মতো লোক কাপড় ইস্তিরি করতাছে! অনেক সময় তিনি বিভিন্ন দেশে গিয়া আমাদের ব্যাগ টানতে চায়। তার নিজের ব্যাগ কোনো সময় কাউকে টানতে দেয় না। তার দুহাতে দুই ব্যাগ, কাঁধেও ব্যাগ থাকে। পারলে আমাদের ব্যাগও চায়। তার সাথে না মিশলে এসব কথা বিশ্বাস করা কঠিন। ইউনূস স্যারের সাথে বিভিন্ন দেশে যাওয়ার সুবাদে পৃথিবীর অনেক বড় বড় নক্ষত্র-মানুষকে আমি পাইছি। এটা আমার জন্য অভাবনীয় ছিল। ড. ইউনূস না থাকলে আমি কোনোদিনও তাদের কাছে যাইতে পারতাম না।
প্রশ্ন : বিখ্যাত মানুষের ছবি তোলার সময় আপনার কেমন অনুভূতি হয়?
নাসির আলী মামুন : কোনো বিখ্যাত মানুষের সাথে দেখা হওয়ার আগে থেইকাই আমার ডান হাতের এই বিশেষ আঙুল- যেটা দিয়া আমি ছবি তুলি সেটা ক্লান্ত প্রজাপতির মতো নড়তে থাকে- কখন তার ছবি তুলতে শাটার-রিলিজ বোতামে চাপ দিবো।
প্রশ্ন : আপনি তো ফিল্ম ফটোগ্রাফি করেছেন। এখন ডিজিটাল ফটোগ্রাফির যুগ। আপনার পছন্দ কোনটি?
নাসির আলী মামুন : ফিল্ম ফটোগ্রাফি আর ডিজিটাল ফটোগ্রাফি- দুইটার স্বাদ দুইরকম। যেমন- সাদা ভাতও খাইতে ভালো লাগে, আবার খিচুড়ি খাইতেও ভালো লাগে। অনেকে খিচুড়ি পছন্দ করে, অনেকের পছন্দ সাদা ভাত। দুইটাই কিন্তু ভালো ভাবার, তাই কোনোটিকেই উপক্ষো করা যায় না। কোনোটিকেই ছোট করা যাবে না। আমার কাছে দুইটাই সমান। আমি দুইটাই পছন্দ করি। ডিজিটাল ছবির সারফেস লেয়ারটা হইলো খাঁড়া ডট। ডটের পর ডট দিয়া ইমেজ তৈরি হয়। আর আমার কাছে মনে হয় ফিল্মের সারফেসটা ওয়াটারকালার লেয়ারের মতো। তবে এই ডিজিটাল যুগেও আমি ফিল্মের এই ওয়াটারকালারটা মিস করি। পৃথিবীর যুগান্তকারী আবিষ্কারগুলোর মধ্যে ডিজিটাল ফটোগ্রাফি একটা। তারপরও ডার্করুমে ফিল্ম ডেভলপ করার আনন্দটা আর পাইনা বলে খুব দুঃখ হয়। ১৯৭৩ সাল থেইকা আমি নিজেই ফিল্ম ডেভলপ করতাম, ছবি প্রিন্টও করতাম। আমার এনলার্জার ছিল ’৭৪ সাল থেইকা।
প্রশ্ন : কোন ধরনের ক্যামেরা আপনার পছন্দ? মানে কোনো নির্দিষ্ট ব্র্যান্ড আছে কি?
নাসির আলী মামুন : একজন লেখককে যদি প্রশ্ন করা হয় আপনার কোন ধরণের কলম দিয়ে লিখতে ভালো লাগে, সে কি উত্তর দেবে? যে কলমে ভালো লেখা হয় সেই কলমই তার পছন্দ হবে। আলোকচিত্রীর ক্ষেত্রেও তাই। ছবি ওঠে এমন যেকোনো ক্যামেরাই আমার প্রিয়। যে লেন্স পরিস্কার, ফাঙাস নাই সেই লেন্সই আমার পছন্দ। এমনিতে নরমাল, মানে প্রাইম লেন্সই বেশি প্রিয়। ৫৫ মিলিমিটার প্রাইম হলে বেশি ভালো। কোনো নির্দিষ্ট ক্যামেরা ব্র্যান্ড নাই। এপর্যন্ত প্রায় ৪০টির উপরে ক্যামেরা ব্যবহার করছি। ওই যে বললাম- লুবিটেল, ইয়াশিকা, ফক্টল্যান্ডার, ক্যানন, নিকন...সব ধরনের ক্যামেরা ব্যবহার করছি। কালকে ‘ব্রোনিকা’ নামের একটা ক্যামেরা ব্যবহার করলাম। দৃক থেইকা ধার নিছিলাম। ওয়ান টুয়েন্টি ফিল্ম, ৮টা এক্সপোজার দেয়। দারুন ক্যামেরা। এইধরনের ক্যামেরা আগে কোনোদিনও ব্যবহার করি নাই। ক্যামেরাটা ধার নিতে হইলো কারণ সাদা-কালো ছবি তোলার জন্য দরকার ছিল। ফটোগ্রাফির প্রথম ৬ বছরে আমি ২টা ক্যমেরা কিনছিলাম। ’৭৩ সালে ‘প্যাট্রি’ নামের একটা জাপানি ক্যামেরা কিনি। নিউমার্কেট থেইকা সাড়ে ৬শ টাকা দিয়া এই থার্টি ফাইভ মিলিটার টুইন লেন্স ক্যামেরাটা কিনছিলাম। সাড়ে ৬শ টাকা তখন অনেক টাকা। ধার-টার কইরা কিনছি। এই ক্যামেরাটা কয়েক মাস চালানোর পর আরেকটা ক্যামেরা পাইলাম। জাপানি ক্যামেরা ‘কাওয়া’। ওইটা ছিল এসএলআর নরমাল লেন্স। ভাবলাম পোরট্রেটের জন্য এসএলআর ভালো হইবো। ৮শ টাকা দিয়া কিনছিলাম। ১৯৭৪ সালের কথা। কয়েক মাস ব্যবহারের পর কাওয়া নষ্ট হইয়া গেল। ঠিক করাই, আবার নষ্ট হয়। এভাবে ক্যামেরাটা ৩২ বার নষ্ট হয়। ৩৩ বার যখন নষ্ট হইলো তখন দোকান থেইকা আর আনি নাই। ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত মাত্র বছর দেড়েক আমার নিজের ক্যামেরা ছিল। ওই ‘প্যাট্রি’ আর ‘কাওয়া’। তার মানে ফটোগ্রাফির প্রায় সাড়ে ৫ বছরে আমার এই দুইটা ক্যামেরা ছাড়া আর কোনো ক্যামেরা ছিল না। ’৭৭ সালের শেষে একটা সেকেন্ডহ্যান্ড ওয়ান টুয়েন্টি ক্যামেরা কিনলাম, ১৮শ টাকা দিয়া। তার আগে ধার করে করে চালাইছি। একটা স্টুডিও মালিকের সাথে ভালো সম্পর্ক ছিল, তার কাছ থেইকা ক্যামেরা ধার করতাম। স্টুডিওতে একটাই ক্যামেরা ছিল। স্টুডিওর কাজ শেষ হইলে আমারে ক্যামেরাটা দিয়া দিতো- এতো ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। আমি ভোরে কাজ করতাম। স্টুডিও খুলতো সকাল ৯টায়, তার অগেই ক্যামেরা ফেরত দিতে আমি স্টুডিওর সামেন দাঁড়ায়ে থাকতাম। দূর থেইকা সেই লোক দেখতো বন্ধ স্টুডিওর সামনে একটা লোক দাঁড়ায়া আছে- সে আমি। সকালে আমি ছবি তুইলা আসতাম। আমি যেহেতু ফ্যাশ ফটোগ্রাফি করি না। নরমাল আলো-ছায়ায় ঘরের মধ্যে ছবি তুলতাম। তাই সকালে এক ঘণ্টা, দেড় ঘণ্টা কাজ করা আমার জন্য কঠিন ছিল না। সকালে কাজ শেষে ক্যামেরা ফেরত দিতাম। এইভাবে সংগ্রাম কইরা কইরা আমি ফটোগ্রাফি করছি। এখনো আমার কোনো ভালো ক্যামেরা নাই। দৈনিক পত্রিকায় আমি ভালো ভালো ক্যামেরা ব্যবহার করছি। পত্রিকা ছাড়ার পর ক্যামারা ফেরত দিছি, ফলে এখনো আমার কোনো দামি ক্যামেরা নাই। বেশি দাম দিয়া ক্যামেরা কেনার টাকা নাই।
প্রশ্ন : বাংলাদেশে ফটোগ্রাফি করতে গিয়ে কি ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয় বলে আপনি মনে করেন?
নাসির আলী মামুন : বাংলাদেশের ফটোগ্রাফাররা অনেক চ্যালেঞ্জের মুখে থাকে। বাংলাদেশের ফটোগ্রাফাররা মানুষ, এরা কেউ ওয়াসার পানি বা হাওয়া খেয়ে বাঁচে না। এদের ভাত খাইতে হয়। জামা-কাপড়ও পরতে হয়। আর এই চাহিদাগুলো পূরণ করতে টাকার দরকার। বাংলাদেশে যারা চাকরি না কইরা সিরিয়াসলি শিল্প হিসেবে অথবা বাণিজ্যিকভাবে ফটোগ্রাফি করে তারা কেউ ভালোভাবে বেঁচে থাকতে পারতাছে? আমার তো মনে হয় না পারতাছে। অনেকেই পত্রিকায় চাকরি কইরা মোটামুটি ভালোই আছে। যারা চাকরি করে না তাদের কয়েকজন ছাড়া কারোরই ভালো আয় নাই। যেমন- আমি। আমাদের ছবি লোকজন কিনতে চায় না। কারণ বাংলাদেশে ফটোগ্রাফির বাজার নাই। দেশটা গরীব-দুর্বল। যারা ধনী তাদেরও রুচি নাই। দুএকজন ছাড়া ফটোগ্রাফি যে শিল্প বড়লোকরা সম্ভবত তাই জানে না। অনেক কষ্টে আমরা আগাইতাছি। বাংলাদেশের যে আর্থিক বিকাশটা হওয়ার কথা ছিল তা হয় নাই।
প্রশ্ন : কাদের তোলা ছবি ভালো লাগে?
নাসির আলী মামুন : বিশ্বের বড় বড় পোরট্রেট ফটোগ্রাফারদের তোলা ছবি ভালো লাগে, যেমন- ইউসুফ কার্শ, রবার্ট ম্যাপলথর্প, রিচার্ড আভেডন প্রমুখ। এন অটোবায়োগ্রাফি নামে আভেডনের একটা বই আছে। ১৯৯৩ সালে নিউইয়র্কে বইটা সে আমারে উপহার দিছিল। বিরাট বই। আত্মজীবনী নাম হলেও বইটাতে আছে অনেকগুলো ছবি। বইটাতে দুপৃষ্ঠা লেখা আছে, সেখানে তিনি লেখছেন- একজন ফটোগ্রাফারের লেখার কিছু নাই, এই ছবিই আমার আত্মজীবনী। আমাকে দেয়া বইটার এক পাতায় একটা ছবিও আঁইকা দিছে। আর হাল আমলে পৃথিবীর এখন অন্যতম শ্রেষ্ঠ পোরট্রেট ফটোগ্রাফার হলো অ্যানি লাইবোভিৎজ। উনি নিউইয়র্কে থাকেন। তার ছবির আমি ভক্ত। তার তোলা অনেক পোরট্রেট দেখি আমি। আউটডোর-ইনডোরে যেসব ছবি তোলেন তা দেইখা আমি অবাক হইয়া যাই, কিভাবে ভদ্র মহিলা এতো ক্লাসিক এবং যন্ত্রণার মুহূর্তগুলা পোরট্রেটে জীবন্ত কইরা তোলেন! তার তোলা হোয়াট হাউসের ছবি দেইখা অবাক হইছি। আবার হাসপাতালে তার ক্যান্সার আক্রান্ত বন্ধু সুসান মারা যাইতাছে সেই ছবিও তুলছে। আর তার সেল্ফ পোরট্রেট তো আরো অসাধারণ। তার সাথে এই মে মাসে (২০১২) শিকাগোতে দেখা হইছিল। নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ীদের নিয়া একটা সম্মেলন হইতাছিল, সেখানে তিনি একটা স্টুডিওর মতো করছিল। ওই স্টুডিওতে তিনি শান্তিতে নোবেলজয়ী ব্যক্তিদের ছবি তুলছে। ইউনূস স্যারেরও অনেকগুলা পোরট্রেট করছেন। আমেরিকার বিখ্যাত ভেনিটি ফেয়ার ম্যাগাজিনের পক্ষ থেকে অ্যানি লাইবোভিৎজ ছবি তুলতে আসছিলেন। তার সাথে ছবি তুললাম। তারপর সে আমারে তার সেল্ফ পোরট্রেট আঁইকা দিছিলেন। প্রিয় দুজন ফটোগ্রাফারের সাথে আমার দেখা হইছে, একজন আভেডন, মারা গেছেন। আর এই অ্যানি লাইবোভিৎজ। বাংলাদেশের অনেকের ছবি আমার ভালো লাগে। নাম বলতে গেলে সমস্যা। ওই যে বললাম, হাঁ কইরা আছে যারা তারা কামড় দিয়া খাইয়া ফেলবে। বলবে, “শালা আমার নাম বলে নাই।”
প্রশ্ন : আপনি তো সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল কিন্টন, বর্তমান প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা উভয়েরই ছবি তুলেছেন?
নাসির আলী মামুন : ইউনূস স্যারের কল্যাণে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল কিন্টনের সাথে আমার কয়েকবার দেখা হইছে। কিন্তু খুব কাছে থেইকা তার পোরট্রেট তোলা হয় নাই। স্যারের কারণে বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা, পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি কিন্টন এবং আরো অনেকের সাথে দেখা হইছে, ছবিও তুলছি। আমি যেখানে বসা ছিলাম তার ঠিক সামনেই ফার্স্ট লেডি মিশেল ওবামা বসেছিলেন। তার কানের পাশে আমার ক্যামেরা টাসটাস শব্দ করছে। ভাবতাছিলাম- সিকিউরিটি আইসা আমারে সরাইয়া না দেয়। কেউ সরাইয়া দেয় নাই। তাতে বুঝছি ফার্স্ট লেডি মিশেল ওবামা অত্যন্ত ধৈর্য্যশীল ও ভালো মানুষ। আমি যেভাবে ৪০ মিনিট একটার পর একটা শাটার টিপছি, ২শ মিলিমিটারের লম্বা লেন্স তার কানের কাছে- কিন্তু তিনি কিচ্ছু বলেন নাই।
প্রশ্ন : এই মুহূর্তে আপনাকে যদি বিশ্বের কোনো বিখ্যাত বা কুখ্যাত ব্যক্তির পোরট্রেট করার সুযোগ দেয়া হয় তাহলে কার ছবি তুলবেন?
নাসির আলী মামুন : নেলসন মান্ডেলার ছবি তুলতে চাইবো। তার ছবি তোলা হয় নাই। মান্ডেলাকে সামনাসামনি দেখিও নাই। বাংলাদেশে যখন আসছিলেন তখন তার কাছে যাওয়ার সুযোগ হয় নাই। তার ছবি তুলতে আগ্রহী আমি।
প্রশ্ন : এমন কয়েকজনের নাম কি বলবেন যাদের সংস্পর্শে এসে বেশি আনন্দিত হয়েছেন?
নাসির আলী মামুন : অবশ্যই। প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস। যারে বলা হয় পৃথিবীর গ্রেটেস্ট সিভিলিয়ন। শুধু নোবেলসহ এতো পুরস্কার পাওয়ার জন্যই না, তার কাজ, ক্যারিশমা, লাইফ অ্যান্ড টাইমসের কারণে তিনি এতো বড়। এই রকম একটা ফিগার পৃথিবীতে আজ পর্যন্ত হয় নাই। এরকম একজন মানুষের ঘনিষ্ঠ হওয়া, তার সাম্রাজ্যে আমার মতো একজন নগণ্য লোকের বাসিন্দা হতে পারাটাকে আমি বিরাট সৌভাগ্য মনে করি। এজন্য আমি নিজের গলায় নিজে প্রত্যেকদিন মালা পরাই। যাদের সংস্পর্শে আসতে পাইরা নিজেকে ভাগ্যবার মনে করি তাদের মধ্যে আরো আছেন শিল্পী এস এম সুলতান ও কবি শামসুর রাহমান।
প্রশ্ন : বিশ্বফটোগ্রাফির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অবস্থান কোথায়?
নাসির আলী মামুন : বিশ্বফটোগ্রাফির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে সম্প্রতি আগাইয়া যাইতাছে। পশ্চিমা দেশগুলোর ফটোগ্রাফারদের সাথে আমাদের দেশের তরুণ ফটোগ্রাফাররাও আছে। ফটোগ্রাফির বিশ্বমিছিলে বাংলাদেশও আছে। এই মিছিলে আমেরিকা, জার্মানি, ফ্রান্স, ইংল্যান্ডের মতো দেশ আছে। ওরা হয়তো সামনের কাতারে আছে, আমরা একটু পিছে আছি। যেহেতু ফটোগ্রাফি আবিষ্কারই হইছে পশ্চিমা দেশে, ফলে আবিষ্কারের সাথে সাথে সে অঞ্চলের মানুষ এর সুবিধা নেয়া শুরু করছে। এই ফটোগ্রাফি আমাদের দেশে আসছে কবে? মাত্র ৬০-৭০ বছর আগে। তুমি আমারে পূর্ববঙ্গের একজন বাঙালি ফটোগ্রাফারের নাম বলো যে ১শ বছর আগে ফটোগ্রাফার ছিল? পাইবা না। ওই অনুযায়ী আমরা অনেক আগাইছি। তারওপর গরীব দেশ, শিক্ষা-দীক্ষা আমাদের কম, সেই তুলনায় আমি মনে করে আমাদের দেশের এখনকার ফটোগ্রাফিতে নতুন জোয়ার আসছে। বাংলাদেশে ফটোগ্রাফির আন্দোলন শুরু হইছে দৃক, পাঠশালা এদের মাধ্যমে। পাঠশালায় একটি মেধাবী প্রজন্ম সৃষ্টি হইছে এবং তারা ফটোগ্রাফিক আন্দোলনটাকে অনেক দূর নিয়া গেছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে গিয়া কাজ করতাছে, বড় বড় অনেক আন্তর্জাতিক পুরস্কার নিয়া আসতাছে। আমরা এগুলো জানতামও, করতামও না। আমি দেশী-বিদেশী কোনো প্রতিযোগিতায় অংশ নেই নাই।
প্রশ্ন : আপনার জীবনে আরেকটি অভিনব ঘটনা ঘটেছিল। আপনি রক্ষীবাহিনীর হাতে ধরা পরেছিলেন, কবি আল মাহমুদের সাথে জেলও খেটেছেন...
নাসির আলী মামুন : ১৯৭৪ সালের ১৭ মার্চ ধরলো আওয়ামী লীগ সরকারের রক্ষীবাহিনী। ওইদিন ছিল জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন। তার আগে বঙ্গুবন্ধুর কয়েকবার পোরট্রেট করছি। কিন্তু তিনি আমারে ব্যক্তিগতভাবে চিনতো না। আমি তাকে অনেক শ্রদ্ধা করি, আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে না। যাইহোক- সেই বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে রক্ষীবাহিনী অনেকরে পিটাইলো, গুলি কইরা মারলো। সরকারি হিসাবেই ৯জন মারা গেছে। কিন্তু আমরা যতদূর জানি, ২০জনেরও বেশি মানুষ হত্যা করা হইছিল। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মনসুর আলীর মিন্টো রোডের বাড়ির সামনে এই হত্যাকা- ঘটনানো হয়। ঘটনার পর সরকার এক প্রেস নোটের মাধ্যমে জানায়, যারা নিহত হয়েছে তারা আইসা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাড়িতে আগুন জ্বালাইয়া দিছিল। আসলে তা না। ওইদিন পল্টন ময়দানে জাসদের মেজর জলিল, আসম আব্দুর রব এবং অন্যান্য নেতা-নেত্রীরা বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে বিরাট সভার আয়োজন করছিল। সভা থেইকা মিছিল নিয়া তারা একটি স্মারকলিপি দিতে মিন্টো রোডে আসে। কোনো আগুন-টাগুন, ইট-পাটকেলের ব্যাপার ছিল না। স্মারকলিপি দিছিলো কিনা আমি জানি না। সম্ভবত দিছিলো। এই মিছিলে অতর্কিত হামলা চালায় রক্ষীবাহিনী। পুলিশ কিছু করে নাই। পুলিশ বরং জাসদের নেতা-কর্মীদের মাইর থেইকা বাঁচাইয়া দিছে। রক্ষীবাহিনী মিছিল ঘেরাও কইরা গুলি করছে। কিছু লোক রমনা পার্কের দিকে ভাইগা গেছে, আমরা অনেকে মাটিতে শুইয়া পড়লাম। ওই শোয়া অবস্থাতেও ওরা গুলি চালায়। রব-জলিল সেখান থেইকাই অ্যারেস্ট হইছে। আমারে ওখান থেইকা ধরছে, আমার হাতে একটা ওয়ান টুয়েন্টি ইয়াশিকা ক্যামেরা ছিল। মিছিলের সাথে আমি ছিলাম। পল্টনেই আমি রব ও জলিলের ছবি তুলছি। আমার ক্যামেরাটা একজন নিয়া নিল, ফিল্মটা ফালাইয়া দিলো। রক্ষীরা অনেক পিটাইলো। রক্ষীরা ক্যামেরাটা পুলিশকে দিলো। পুলিশ আমারে নিয়া গেলÑ শাহবাগের পাশে পুলিশ কন্ট্রোল রুম ছিল সেখানে। সেখান থেইকা রক্ষীবাহিনীর গাড়িতে কইরা আমারে নেয়া হইলো রমনা থানায়। থানার ওসি ক্যামেরাটা রাইখা দিল। আমি ভাবছি ক্যামেরা আর পাওয়া যাইবো না। আমারে ভাবছে সাংবাদিক, তাই পুলিশের হেফাজতে রাখছে। আসলেই সাংবাদিক কিনা রক্ষীরা দেখতে চাইছে। রক্ষীরা আইডি কার্ড চাইছে, কইছি, পইড়া গেছে। জিজ্ঞাসা করছে, কোন পত্রিকা? তখন মুক্তিযোদ্ধা সংসদের একটা সাপ্তাহিক পত্রিকা ছিল- গ্রেনেড। বছরখানিক বের হওয়ার পর বন্ধ হইয়া যায়। বলছি, সেই পত্রিকার সাংবাদিক। যার জন্য রক্ষীবাহিনী হোঁচট খাইয়া আমারে পুলিশের হাতে দিয়া দিছে। পুলিশ ভালো ব্যবহার করছে, রাতে খাইতেও দিছে। আমি মাথা নিচু কইরা থানায় বইসা আছি, আমার সাথে সব চোর, বদমায়েশ, পকেটমার। জাসদের কেউ নাই, তাদের সবাইরে কারাগারে পাঠানো হইছে। রাত আড়াইটার দিকে পরিচিত একটা কণ্ঠ শোনা যাইতাছে। চোরদের সাথে কথা বলতাছে। আড়চোখে তাকাইয়া দেখি যে কবি আল মাহমুদ। কবির ছবি তুলছি আমি ১৯৭৩ সালে। আমি তখন আবার মাথা নিচু কইরা রইলাম। আমি লজ্জা পাইতাছি, আমারে যদি চিনে ফেলে? আল মাহমুদ সবার সাথে কথা বলতে বলতে আমার কাছাকাছি চইলা আসলো। আমাকে বললেন, “এই যে ভদ্রলোক দেখি-দেখি”। আমি তখন মাথা উঠাইলাম, “আরে তুমি!” আল মাহমুদ অবাক হইলেন। আমাকে তার চেনাচেনা লাগতাছে। আমাকে তিনি তখনো সেইভাবে চেনেন না। দেখছে কয়েকবার। তিনি তখন জাসদের গণকণ্ঠ পত্রিকার সম্পাদক। পুলিশ তাকে তার বাসা থেইকা ধইরা নিয়া আসছে। আমারে জিজ্ঞাসা করলেন “কি হইছে?” আমি ঘটনা বললাম। একদম কাঁইদা ফেললাম। সে আমাকে সাহস দিল, “অসুবিধা নাই, আমাকেও ধইরা নিয়া আসছে। চিন্তা কইরো না, আমাদের কোনো অসুবিধা হইবো না।” তার হাতে একটা বলপেন, একটি ছোট কবিতার বই। বইটা কলকাতা থেকে বাইর হইছিল- ‘আল মাহমুদের কবিতা’। তার গায়ে একটি ফুল প্যান্ট ও হাফ টিশার্ট। তার সাথে অনেক কথা বললাম। রাত্রে ঘুম হইলো না। পরেরদিন ভোরবেলা পুলিশের ভ্যান আইসা আমাদের নিয়া গেল ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে। গাড়িতে করে আমরা যাচ্ছি, সারা শহর তখন স্তব্ধ। কারফিউর মতো অবস্থা। আমাদের নিয়া যাইতাছিল জিপিও’র সামনে দিয়া। দেখলাম দাউদাউ কইরা জ্বলতাছে জাসদের অফিস। গ-গোল দেইখা পুলিশের গাড়ি আর নবাবপুর দিয়া গেল না। গেল বঙ্গবাজারের ওদিক দিয়া। তখন অবশ্যও বঙ্গবাজার ছিল না, ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনও ছিল না। কেন্দ্রীয় কারাগারে নিয়া আমারে দুপুর ৩টা পর্যন্ত বসাইয়া রাখছে এবং আমার হাত পেছনে হ্যান্ডকাপ দিয়ে বাঁধা। আল মাহমুদ যেহেতু কবি-সম্পাদক তাই তার হাত বাঁধা না। আল মাহমুদ বারবার পুলিশের কাছে রিকয়েস্ট করতাছে, “আমরা তো কারাগারের ভেতরেই চইলা আসছি, এই ছেলেটার হাতটা ছাইড়া দেন।” এমএ আউয়াল নামে জাসদের একজন নেতা তখন কারাগারে, তার স্ত্রী আসছে তার সাথে দেখা করতে। এমএ আউয়ালের স্ত্রীও অনুরোধ করলেন, “ছেলেটার হাতটা ছাইড়া দেন, বাচ্চা মুনষ।” পুলিশ তবুও খুইলা দিল না- এত্তো হারামি! পুলিশ আদি যুগ থেইকাই হারামি। বাংলাদেশে পুলিশ যখন তার পোশাক পরছে তখন তার মধ্যে একটা অশুভশক্তি চইলা আসে। আর যখন অস্ত্র হাতে পাইছে তখন সেই অশুভশক্তি বিদ্যুতায়িত হইছে। অন্য দেশের পুলিশের কাহিনী আলাদা। যাইহোক। কবি আল মাহমুদের সাথে কারাগারে ছিলাম। আমাদের সিনিয়ার ভাই মুক্তিযোদ্ধা আবদুল আজিজ তখন বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাধারণ সম্পাদক। ছাত্রলীগের লোক ছিল। উনি তাদের গ্রেনেড পত্রিকা থেইকা আমার নামে আইডি কার্ড বাইর কইরা ঢাকার এসপিকে ধরলো। পুলিশ প্রশাসনের ইতাহাসে এই এএসপি মাহবুব সবচেয়ে হারামি ছিল। সে-ই সিরাজ সিকদাররে মারছে। জীবিত আছে এখনো। আবদুল আজিজ ভাই তার কাছে গেল। সে তখন যেকোনো লোকের কাছে যাইতে পারতো। এসপি মাহবুব বলে, “না। ওতো জাসদ করে, আমি ছাড়বো না।” সে ছাড়লো না। তারপর ভাই গেল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ক্যাপ্টেন মনসুল আলীর নির্দেশে ৯দিন পর আমি ছাড়া পাইছি। আল মাহমুদ ভাইরা ছিলেন এক বছর। এক বছর পর ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করলো, তখন আল মাহমুদ ও অন্যান্যরা বাইর হইয়া আসলো। বাইর হইয়া আল মাহমুদ ভাই চাকরি পায় না, খুবই খারাপ অবস্থা তার। এতোগুলা ছেলে-মেয়ে নিয়া সে কোথায় যাবে? তারে দুই কারণে কেউ চাকরি দেয় নাই, প্রথমত সে জাসদ করতো, দ্বিতীয়ত সে বড় কবি। তার মতো এতো বড় একজন কবিরে পরে বঙ্গবন্ধু সরকারই চাকরি দিছিল। শিল্পকলা একাডেমীতে একটা কেরানির মতো চাকরি সে পায়। পরিচালকও তারে করা হয় না। যুক্তি দেখাইছে- তার শিক্ষাগত সার্টিফিকেট নাই। যাইহোক, বাংলাদেশের একজন ফটোগ্রাফার হিসেবে আমার সৌভাগ্য কবি আল মাহমুদের সাথে জেল খাটছি। জেল থেইকা বাইর হইয়া, পরেরদিনই গেলাম রমনা থানায়। আমার আত্মাটা তো ওইহানেই রইয়া গেছে। আমি ভাবছিলাম, ওরা আমার ক্যামেরা তো দেবেই না বরং হেনস্তা করবো। তরুণ-স্মার্ট শিক্ষিত ওসি, আমারে খুব খাতির-টাতির করলো, চা খাওয়াইলো, বললেন, “দেখেন ওগুলার মধ্যে আর যাইয়েন না। জাসদ করেন?” আমি বললাম, “না।” বললেন, “না, আপনি করেন, না করলে কি আপনাকে ধইরা আনে?” কইলেন, “আপনার ক্যামেরা যেভাবে ছিল সেভাবেই আছে, আমি পরিস্কার কইরা রাখছি।” ক্যামেরাটা দিল, প্যাকেট করা, সত্যিই পরিস্কার।
প্রশ্ন : সেই ঐতিহ্যবাহী প্রশ্ন মামুন ভাই- ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কি?
নাসির আলী মামুন : ‘ফটোজিয়াম’ নামে ফটোগ্রাফি ভিত্তিক একটি জাদুঘর করতে চাই। এটা হবে আমার ব্যক্তিগত আর্কাইভের মতো। জাদুঘর দেখার জন্য দর্শক আসবে, পাঠক আসবে। এই জাদুঘরে আমার তোলা ছবি, বিভিন্ন বিখ্যাত ফটোগ্রাফারদের সেল্ফ পোরট্রেট, আমার তোলা নয় কিন্তু আমার সংগ্রহে থাকা ষাট ও সত্তর দশকে স্টুডিওতে তোলা কিছু পোরট্রেট, সে আমলের ক্যামেরা ইত্যাদি রাখতে চাই। আর প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে নিয়া একটা পুরা ফোর থাকবে। ফটোজিয়ামের কিছুই হয় নাই। এখানে (সাভার) করার জন্য আমি আয়োজন করছি। আমি বিভিন্ন জায়গায় কর্মশালা করতে গেলে এবং সাক্ষাৎকারে বলি। আমার কেনা জমি আছে, জিনিসপত্রও আছে, এখন একটা ভবন বানানো বাকি। প্রায় ৬ কোটি টাকা দরকার লিফ্ট, এসি ও ডেকোরেশনসহ ভবন করতে। দেশী-বিদেশী শিল্পমনা, ব্যবসায়ী, শিল্পপতিরা যদি আগায়ে আসে অথবা কোনো তরুণ আসলো ফান্ড রেইজ করার ভালো আইডিয়া নিয়া- আমি তাদের স্বাগত জানাই। তারা যদি আমাকে পরামর্শও দেয় যে কিভাবে জাদুঘরটা গড়ে উঠতে পারে তাও আমি গ্রহণ করবো। বাংলাদেশে ফটোগ্রাফি ভিত্তিক কোনো জাদুঘর নাই। বিখ্যাত লোকদের পাণ্ডুলিপি-চিঠি-ডায়েরি-ব্যবহৃত জিনিসপত্রের একটা বড় সংগ্রহ আমার আছে। অমার কাছে যতগুলা পাণ্ডুলিপি আছে সম্ভবত বাংলা একাডেমীর কাছেও ততো নাই। অনেক অপ্রকাশিত অডিও-ভিডিও সাক্ষাৎকার আছে আমার সংগ্রহে। আরো আছে এস এম সুলতানের দাঁত, শামসুর রাহমানের চুল, জুতা, শার্ট, চশমা। শামসুর রাহমান শার্টে লিখে দিছে- “আমাকে ভুলে গেলে ক্ষতি নেই, আমার কবিতাকে মনে রেখো।” শার্টটা যখন দেখি তখন কান্না আসে। এগুলাও যদি জাদুঘরে রাখতে পারি তাহলে মানুষ দেখতে পারবো। শুধু আমার তোলা ছবি থাকলে মানুষ দেখবো না। এজন্য এই জিনিসপত্রগুলা, অন্যান্য ফটোগ্রাফারদের সেল্ফ পোরট্রেট এবং ড. ইউনূস সংগ্রহশালা রাখবো। ইউনূস স্যারের হাতে আঁকা কিছু ছবি আমার কাছে আছে। যেগুলো পৃথিবীর আর কারো কাছে নাই। এগুলাও রাখবো।
প্রশ্ন : ফটোগ্রাফির উন্নয়নে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো কি করতে পারে?
নাসির আলী মামুন : ফটোগ্রাফির উন্নয়নে সরকার কোনোদিনও চিন্তা করে নাই, এখনো করে না। যদি করতো তেইলে ঢাকা বিশ্বাবিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগে অথবা আলাদা একটা বিভাগে ফটোগ্রাফি থাকতো। থাকা উচিত। বাংলাদেশে এই যে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হইতাছে ওদেরও একটা করে ফটোগ্রাফি বিভাগ থাকা উচিত। যদি আলাদা বিভাগ করতে নাও পারে, অন্তত সাংবাদিকতা বিভাগের সাথে যুক্ত করে দিতে পারে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর শিল্পকলা একাডেমীর জন্ম হইছে। এতো বছরে শিল্পকলা একাডেমীর ফটোগ্রাফি নিয়া একটা আলাদা বিভাগ থাকা উচিত ছিল না? যেখানে ওদের চারুকলা বিভাগ আছে, প্রকাশনা বিভাগ, সঙ্গীত বিভাগ আছে- এমনকি নৃত্যুকলা বিভাগ আছে। থাকা উচিতও। সেখানে ফটোগ্রাফির একটা বিভাগ থাকা উচিত ছিল। আমি নৃত্যশিল্পীদের বিপক্ষে যাইতাছি না। নৃত্যশিল্পকে স্যালুট দিই আমি। কিন্তু বাংলাদেশে কত হাজার লোক এই শিল্পের সাথে জড়িত? আর কত লাখ মানুষ ফটোগ্রাফিশিল্পের সাথে যুক্ত? এবং কত পুরস্কার পাইছে ফটোগ্রাফাররা? কয়টা পুরস্কার পাইছে নৃত্যশিল্পীরা? ফটোগ্রাফিশিল্পের গুরুত্ব বুঝাইতে এই উদাহরণ দিলাম। মন্ত্রণালয় বা সরকার ফটোগ্রাফিকে শিল্প হিসেবে নিতাছে না। আমাদেরকে একুশে পদক, স্বাধীনতা পদক- এসব রাষ্ট্রীয় পদকগুলা কেন দেয়া হয় না? এই হাল আমলে দিছে। এর আগে কোনোদিন দেয় নাই। সম্প্রতি রশীদ তালুকদার পাইলো, আমানুল হক সাহেব পাইলো। নাইব উদ্দিন আহমেদ পান নাই, ড. নওয়াজেশ আহমেদ পান নাই। এসব রিকগনেশন তো আমরা পাইতে চাই। এগুলো আমরা দাবি করি। এগুলা পাওয়ার অধিকার আমরা রাখি।
আর ফটোগ্রাফির উন্নয়নে গণমাধ্যম যা করতে পারে তা আর কেউ করতে পারে না। দৈনিকগুলাতে একজন ফটো এডিটর থাকা দরকার। আমাদের মিডিয়ার সবকিছু ভিজ্যুয়াল। একটা দৈনিক পত্রিকায় প্রতিদিন অনেক ছবি ছাপা হয়। ম্যাগাজিনগুলাতেও অনেক ছবি ছাপা হয়। সেই ছবিগুলা ঠিকমতো নির্বাচন করা, ছাপা এবং ক্যাপশন দেয়া এবং ভালো ছবি তোলার জন্য ফটোগ্রাফারদের দিক-নির্দেশনা দিতে একজন মুরুব্বির দরকার। সেই মুরব্বিই ফটো এডিটর। আমাদের পত্রিকাগুলাতে ফটো এডিটর আছে? নাই। আমি যেমন দৈনিক প্রথম আলোর ফটো এডিটর ছিলাম দীর্ঘদিন। ফটোগ্রাফারদের আমি পরামর্শও দিতাম। কিন্তু বেশিরভাগ সময় দেখতাম- আমি ফটো এডিট কইরা যে ফোল্ডারে রাখতাম সে ফোল্ডারটা নাই। কে বা কারা উধাও কইরা ফেলতো। পরেরদিন পত্রিকা খুইলা দেখতাম আমি যে ছবিগুলা নির্বাচন করছিলাম সেগুলো ছাপা হয় নাই। তাহলে কিসের জন্য আমার পদটা? এটা কি প্রহসন না? আমার কাজটি করতেন নিউজ এডিটর। তিনি তো ফটোগ্রাফি বিষয়ে বিশেষজ্ঞ না। ফটোগ্রাফি বিষয়ে উনি মূর্খ। কিন্তু ছবি নির্বাচন সেই করতো। আর আমার নির্বাচনকে উপেক্ষা করতো। এবিষয়ে বহুবার আমি দৈনিক প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান সাহেবের সাথে আলাপ করছি। কিন্তু কোনো কাজ হয় নাই। মতিউর রহমান সাহেবের সাথে আমার শ্রদ্ধার সম্পর্ক। তিনি আমাকে এখনো স্নেহ করেন। আমি যে কি উনি তা জানেন। আর সবগুলো পত্রিকার উচিত দেশে যারা বরেণ্য শিল্পী আছে, কাজের লোক, মেধাবী তাদেরকে বিকশিত হওয়ার সুযোগ দেয়া। কিন্তু বিকশিত হওয়ার সুযোগ কোন ফটোগ্রাফারদের দেয়? যারা অনেক জুনিয়ার। তারা ৬তলা পর্যন্তও উঠতে পারবে না। যারা তাদের সুযোগ দেয় তারা জানে এরা দোতলা-তিনতলা পর্যন্ত যাইতে পারবো। তারপরও সুযোগ দেয় কারণ এদের দিয়ে তারা তাদের স্বার্থ হাসিল করতে চায়। এ কারণে তারা ওদেরকে প্যাট্রোনাইজ করে, বিদেশে পাঠায়, ছবি ছাপে, নাম ছাপে, তাদের ওপরে লেখা ছাপে। কিন্তু যারা মাস্টার হইয়া গেছে তাদেরকে তারা মূল্যায়ন করে না। যাইহোক। এখন যে সময় চলতাছে- এসময়ে ঢাকার রাস্তায় দাঁড়াইয়া তুমি যদি একটা ফুঁও দেও তা পৃথিবীর সকল মানুষের কানে গিয়া লাগবে। কাজেই আফসোস কইরা লাভ নাই। আমার দেশে তুমি আমারে পাত্তা দিতাছো না, আমারে শিল্পী বইলা মনে করতাছো না বা মনে করলেও সুযোগ দিতাছো না- অন্য জায়গায় দেবে। মৃত্যুর পর হইলেও দিবে। আমি তো এমন শিল্পী হইতে চাই যে মৃত্যুর পরও বাঁইচা থাকবে। জীবিত অবস্থায় আমি কি করলাম, আমার কয়টা সাক্ষাৎকার ছাপা হইলো, নাম কোথায় কোথায় ছাপা হইলো সেটা দেইখা পুলকিত হওয়ার চেয়ে মৃত্যুর পরও আমি কতদিন বাঁইচা থাকমু সে হিসাব করাটাই আমি সবচেয়ে বেশি বুদ্ধিমানের কাজ বইলা মনে করি। পাঠকরা জানে না, বাংলাদেশের প্রায় সব পত্র-পত্রিকার ভিতরটা হইলো অগণতান্ত্রিক এবং স্বেচ্ছাচারী। যারা মেধাবী ও নিরীহ সাংবাদিক-ফটোসাংবাদিক পত্রিকাগুলো তাদের ওপরে এক ধরণের মানসিক অত্যাচার চালায়। তাদের পদোন্নতি কম হয়, বেতম কম থাকে। যারা সম্পাদকের চামচাগিরি করে, মিথ্যা কথা বলে, দুনম্বরি করে এবং যারা সাংবাদিকতার নামে অবৈধভাবে সম্পদ ও অর্থ উপার্জন করে তাদেরই পদোন্নতি হয়, উন্নতি হয়। আমি এসব নিজের চোখে দেখছি, নাম বলতে চাই না। পাঠকরা যদি জানতো পত্রিকার ভিতরে কি হয়, তথাকথিত দুনম্বর সাংবাদিক ও সম্পাদকরা কি করে তাহলে তারা পত্রিকা পড়া বন্ধ কইরা দিতো।
প্রশ্ন : এমন কোনো স্বপ্ন আছে যা আজো পূরণ হয়নি?
নাসির আলী মামুন : আমি যত স্বপ্ন দেখছি তার প্রায় সবই পূরণ হইছে। কোনো কোনোটা হয়তো সম্পূর্ণ পূরণ হয় নাই, আংশিক হইছে। এখন ‘ফটোজিয়াম’টাকে আমি বাস্তাবে দেইখা যাইতে চাই। আগামী ৩ থেইকা ৪ বছরের মধ্যে আমি এইটা দেখতে চাই। আর আমার কোনো ফটোগ্রাফির ভালো বই নাই, ভালো বই করতে চাই। যাতে তরুণ প্রজন্ম, আগামী প্রজন্ম আমার কাজ দেখতে পারে। আমার যে আসল কাজ এগুলো কেউরে আমি দেখাইতে পারি নাই। বইয়ের কাজ শুরু হইছে, আমি ফটোশপ ও প্রোডাকশনের কাজ করতাছি। আশা করি এক বছর পর আমার একটা ভালো বই বাইর হইবো। তারপর আরো বই বাইর হইবো।
প্রশ্ন : আপনি ঢাকার ছেলে। আগের ঢাকা আর এখনকার ঢাকাকে কেমন করে দেখেন?
নাসির আলী মামুন : আগের ঢাকা আর এখনকার ঢাকার মধ্যে অনেক পার্থক্য। পার্থক্য হওয়াটা স্বাভাবিক। কিন্তু আরো দ্রুত পরিবর্তন হওয়া দরকার ছিল। রাজধানী ঢাকার বয়স ৪শ বছর হইছে। কিন্তু ৪শ বছরে এই শহরের যে পরিবর্তন হওয়ার কথা ছিল তা হয় নাই। প্রধানত দুইটা কারণে হয় নাই- প্রথমত গরীব দেশ, দ্বিতীয়ত পরিকল্পনাহীনতা। সুন্দর-সুস্থ পরিকল্পনা না থাকায় ঢাকা শহরটা ঠিক মতো পাকে নাই, কুঁড়ির মধ্যেই রইয়া গেছে। একটা ফল দীর্ঘদিন কুঁড়িতে থাকলে তখন ওইটার মইধ্যে পোকা ঢোকে। তেমনি ঢাকা শহরে পরিকল্পনা ছাড়া এই যে ঘর-বাড়ি-বিল্ডিং হইছে এগুলো সব পোকা-মাকড়ের মতো। ড্রেনেজ সিস্টেম ভালো না। গুলশান-বনানীতে যাও, দেখবা সুন্দর সুন্দর সব বিল্ডিং। কিন্তু ওই বিল্ডিংয়ের নিচের ড্রেনেজ সিস্টেমের অব্যবস্থাপনা দেইখা তুমি অবাক হইয়া যাইবা। সিটি করপোরেশনের সকল স্ট্রাকচার ঘুণেধরা। পরিকল্পনা অনুযায়ী কিছু হয় নাই বইলা ঢাকা শহর ঠিকমতো বিকশিত হয় নাই। সুস্থভাবে হয় নাই বইলাই অসুস্থ শহর। এই শহরটা দেইখা এখন কষ্ট লাগে, এই শহরে আমি বসবাস করি। একটা অসুস্থ পরিবেশের মধ্যে যদি একজন সুস্থ মানুষ থাকে সেও তো অসুস্থ হইয়া যায়, অন্তত মানসিকভাবে। আমরা এখন যেই শহরে আছি তা পক্ষাঘাতগ্রস্থ, সংক্রামিত রোগীদের শহরের মতো। ঢাকা শহরে থাকাটা নিরাপদ বলে আমি মনে করি না, কেউই করে না। কোথায় যাবো? কোথাও যাওয়ার জায়গা নাই, আমার দেশ, আমার জন্মভূমি। দুঃখ হয় এই কারণে- শহরটাকে সুন্দর করতে আমরা পারতাম। আমরাই শহরটারে নষ্ট করছি। সরকার নষ্ট করছে, যারা এই শহরের নাগরিক তারাও নষ্ট করছে। নিঃশ্বাস নিতে আমি মূল ঢাকা থেইকা দূরে থাকি। কিন্তু কাজ যখন করি তখন অসুস্থ জায়গায় গিয়াই করতে হয়।
প্রশ্ন : ফটোগ্রাফার মানে যেন শুধু ছবি তোলা। কিন্তু আপনি ছবি তোলার পাশাপাশি কলম চালানো শুরু করলেন। লেখালেখির শুরুটা কিভাবে হলো?
নাসির আলী মামুন : আমার প্রথম লেখা ছাপা হইছিল পল্লীকবি জসীম উদ্দীন মারা যাওয়ার পরপরই। ১৯৭৬ সালে লেখাটা ছাপা হইছিল শাহাদত চৌধুরী সম্পাদিত সাপ্তাহিক বিচিত্রায়। জসীমউদ্দীন মারা গেলেন ১৪ই মার্চ আর লেখাটা ছাপা হইলো এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহের সংখ্যায়। ওই সংখ্যায় জসীম উদ্দীনকে নিয়া ৩টা লেখা ছাপা হয়। দিলারা হাশেমের একটা, আরেকটা কবি অসীম সাহার, আরেকটা লেখা আমার। সাথে আমার তোলা জসীম উদ্দীনের ছবিও ছাপা হইছিলো। আমার নাম তো নাসির আলী মামুন। শাহাদত ভাই বললেন, “না এটি ছদ্মনাম।” উনি একজন আধুনিক লোক, মুক্তিযোদ্ধা। বাংলাদেশে আধুনিক ম্যাগাজিনের প্রবর্তক। কিন্তু তারপরও উনি আমার নামটা মাইনা নিতে পারলেন না। জিজ্ঞাসা করলেন, “আসল না কি?” বললাম, “নাসির আলী খান। কিন্তু নাসির আলী মামুন নামেই ফটোগ্রাফি করি, এই নামই রাখেন।” বললেন, “না-না, এই নাম হইতে পারে না।” উনার মতো লোক আমার অনিচ্ছা সত্ত্বেও নাসির আলী খান দিয়াই লেখাটি ছাপলেন। আর ছবি ছাপছে তাতে আমার নাম দেয় নাই। তার অনেক পরে সচিত্র সন্ধানী পত্রিকার দায়িত্বে থাকা গল্পকার সুশান্ত মজুমদার বললেন, আপনার এতো অভিজ্ঞতা , সেগুলো নিয়া লেখন না। আমি বললাম, আমি তো লিখতে পারি না। তিনি বললেন, এই যে আমাদের সাথে যেভাবে কথা বলেন সেভাবেই লেখেন। ওই পত্রিকার প্রত্যেক সংখ্যায় ‘ছবির কথা’ নামে লেখা শুরু করলাম। ৩ পৃষ্ঠা, ৪ পৃষ্ঠা কইরা ছবিসহ লিখতাম। এভাবে লিখছি প্রায় বছর দেড়েক। তারপর ’৮৮ সালে আমেরিকায় চইলা গেলাম। ওখানে সাপ্তাহিক বাঙালী নামে ট্যাবলয়েড আকারের একটা পত্রিকা আছে। সেইটার সম্পাদক কৌশিক আহমেদ বলল, আপনি লেখেন। কৌশিকের কাগজে আমি এক বছরের বেশি সময় লিখছি। ছবি থাকতো, সেই ছবির পেছনের কথা লিখতাম। ঢাকায় যখন ফিরা আসলাম তখন আবু হাসান শাহরিয়ার আমাকে লিখতে উৎসাহ দিলো। সে তখন মুক্তকণ্ঠ-এর সাহিত্য সম্পাদক। ৪ পৃষ্ঠার কালারফুল সাময়িকী। নতুন নতুন লেখা, নতুন লেখদের লেখা, প্রবীণদের লেখা...ভীষণ সুন্দর। আমাকে সে প্রথম উৎসাহ দিলো। লেখার জন্য এতো জায়গা বাংলাদেশের আর কোনো সম্পাদক দেয় নাই। দিতেও পারবো না। মানে নিকট ভবিষ্যতে এই দেশে কোনো নতুন লেখকের জন্য এমন কোনো সাহিত্য সম্পাদক নাই যে এতো জায়গা দিতে পারবে। একটা দৈনিকের দেড় পৃষ্ঠা, পৌনে দুই পৃষ্ঠা সে আমাকে দিতো। কোনো সম্পাদকের পক্ষে এই কাজ সম্ভব না। এতো উদারমনা সাহিত্য সম্পাদক বাংলাদেশে একজনও নাই। নিকট ভবিষ্যতেও আর হবে না। অদূর ভবিষ্যতে যদি হয়, তোমরা যদি করো।
প্রশ্ন : আপনি তো বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ দেখেছেন। সেসময়েয় কথা কিছু বলবেন?
নাসির আলী মামুন : একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় আমার অল্প বয়স। ঢাকা কলেজে পড়তাম। আমার বড় ভাই ছিল মুক্তিযোদ্ধা। যুদ্ধের অনেক পরে উনি মারা যান। রেশাদ তারই ছেলে। বড় ভাইয়ের কারণে অনেক মুক্তিযোদ্ধা আমাদের বাসায় আসতো, রাত্রে থাকতো। অনেক সময় তারা আগ্নেয়াস্ত্র রাইখা যাইতো। বাজারের ব্যাগে কইরা সেগুলো নিয়া আসতো। ব্যাগের উপরে থাকতো শাক-সবজি, ভিতরে থাকতো এসএমজি, বারুদ, ডেটোনেটর, গ্রেনেড ইত্যাদি। যারা আসতেন তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন সেসময়ের ঢাকা সিটির কমান্ডার মুক্তিযোদ্ধা আবদুল আজিজ ভাই। পরে মারা গেছেন। বড় ভাইয়ের আরো অনেক মুক্তিযোদ্ধা বন্ধুরা আসতো। তারা এমন এমন সময় অস্ত্রভর্তি ব্যাগ নিয়া বাড়িতে আসতো যে আশেপাশের লোকরা সন্দেহ করতো। বিকেলে তো কেউ বাজার করে না, তারা বিকেলেও আসতো। আমরা তখন থাকতাম কাঁঠাল বাগানের কাছে, আল-আমিন রোডে। আমাদের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এক বিহারী পরিবার ছিল। তাদের সাথে দীর্ঘদিন গ্রিন রোড ছিলাম। একদিন ওরাই আমাদের ধরাইয়া দিলো। অক্টোবর মাসের ঘটনা। রাত আড়াইটার দিকে পাকিস্তানি বাহিনী আমাদের বাড়ি ঘেরাও করলো। আল্লাহর রহমত- দুইদন আগে আমার বড় ভাই এবং তার বন্ধুরা বাসা থেইকা চইলা গেছিল। অস্ত্র কিন্তু তখনো ছিল। বাসাটার নিচে দেয়াল, উপরের টিন ও হার্ডবোর্ডের পিছনে অস্ত্র ছিল। বাসা তন্নতন্ন কইরা খুঁইজাও ওরা অস্ত্র পাইলো না। সিলিংয়ের নিচে হাত দেয় নাই, দিলেই ধরা পইড়া যাইতাম। তারপরও পাকিস্তানি বাহিনী আমাকে, আব্বাকে, বাড়িওয়ালার ছেলে এবং অন্যান্য তরুণ ভাড়াটিয়াদের ধইরা নিয়া গেলো। তাদের হাতে ১৫ দিন আটক ছিলাম। পূর্ব পাকিস্তানের সামরিক আইন প্রশাসকের কার্যালয় ছিল, যেটা পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক পরিষদ ভবন ছিল ওইটার পাশে অনেকগুলা এমপিও হোস্টেল ছিল- সেগুলা হইয়া গেল কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প। বাথরুম ও পাকঘরের মধ্যে ৮-১০জন কইরা আসামী রাখতো। খাইতে দিতো না, অত্যাচার করতো। ওইসব জায়গা থেইকা আসছি তো আমি। গত কয়েক বছর যাবৎ দেখতাছি যে জেলায় জেলায় ভাষা সৈনিক বাইর হইয়া গেছে। দেখলাম সাংবাদিকরা ছবিসহ সেসব নিউজ ছাপতাছে। বয়স কত? ৭৫-৭৮। কিভাবে সম্ভব? ভাষা আন্দোলনের সময় তার কত বয়স ছিল? কিভাবে সে ভাষা সৈনিক হয়? এমন মুক্তিযোদ্ধাও দেখি বাইর হইছে। কি করছে? মুক্তিযোদ্ধাদের ডাব খাওয়াইছিল, মুক্তিযোদ্ধাদের নৌকা দিয়া পার কইরা দিছে একবার, অনেকে তো কিছুই করে নাই। যে কেউ নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা দাবি করতাছে। আমরা এমন দাবি করি না। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ছিলাম, মুক্তিযুদ্ধ চাইতাম, পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে ধরাও পড়ছিলাম, মাইরও খাইছি- এই আরকি। সরাসরি মুক্তিযুদ্ধ করি নাই।
প্রশ্ন : স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশ কতটা এগিয়েছে বলে আপনি মনে করেন?
নাসির আলী মামুন : মুক্তিযুদ্ধের পরে, ১৬ ডিসেম্বরের পরের দিন বাংলাদেশ যে জায়গায় ছিল এক অর্থে এখনো ঠিক সেই জায়গায় দাঁড়াইয়া আছে। আর আরেকদিক দিয়া দেখলে, অনেক দূর আগাইয়া গেছে। মনে করো, আমার ছেলে বিদেশে থাকে, আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন ইঞ্জিনিয়ার। নাসায় চাকরি করে। আর আমার বাবা কিচ্ছু করতে পারে না- মৃত্যুপথযাত্রী। ওই মৃত্যুপথযাত্রী রোগীর মতো আমাদের প্রশাসন, রাজনীতি, রাজনীতিবিদ এবং উন্নয়ন এক জায়গায় দাঁড়াইয়া আছে। আর অন্যান্য দিকে বিকশিত হইছে- শিল্পকলায় হইছে, সাহিত্যে হইছে। ওদিকে মুক্তিযুদ্ধের পরে আমাদের সবচেয়ে বড় অর্জন নিয়ে আসছেন প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস। আরো নানা দিকে বাংলাদেশ আগাইতাছে। আগাইলে কি হবে? আগেই তো বললাম, রাজনীতি হইলো এই যুগের নিয়তি। তোমার ভাগ্য যদি তোমার পক্ষে না যায় তাহলে তো তুমি আগাইতে পারবা না । তোমার পুরা বাড়িতে সবাই যদি সুখে-শান্তিতে থাকে, একটা সুন্দর অবস্থায় থাকে, তাহলে না তোমার হ্যাপি ফ্যামিলি। আর তোমার বাড়িতে তুমি একা ভালো আছো, আর সবাই অসুস্থ, কারো ক্যান্সার, কেউ মৃত্যুপথযাত্রী, কেউ মাদকাসক্ত- তার মানে তুমি শান্তিতে নাই। পুরা বাংলাদেশের ওই অবস্থা। অস্থির রাজনীতি থেইকা যদি আমরা বাইর হইতে না পারি তাহলে এই অবস্থা চলতে থাকবে। দেশের উন্নয়ন করবে কে? দেশের উন্নয়নে দেশের প্রত্যেকটা লোক সহযোগিতা করবে, অংশগ্রহণ করবে, বাধা দেবে না। কিন্তু উন্নয়নটা করবে তারা যারা দেশ চালায়, রাজনীতি করে। প্রধানমন্ত্রী থেইকা শুরু কইরা প্রত্যেকটা মন্ত্রণালয়। তারা কি পারতাছে? পারতাছে না। ৪০ বছরে তারা যে প্রক্রিয়ায় লণ্ঠন ও হত্যাকা- চালাইতাছে, রাজনীতিকে অস্থির কইরা তুলছে সে প্রক্রিয়ায় এমন একটা দরিদ্র দেশের কি থাকে? থাকে কিছু? ‘বটমলেস বাস্কেট’ তো এমনিতেই হইয়া গেছে দেশটা। এইটা তো হেনরি কিসিঞ্জারের বলার দরকার হয় না। এই দেশটার কি হবে? যে দেশের টাকা-পয়সা কিচ্ছু নাই সে দেশে বড় কোনো স্বপ্ন দেখা সম্ভব না। সে দেশে বড় কোনো মেধাবী মানুষের জন্ম হবে না। ওই একজন হইয়া গেছে প্রফেসর ইউনূস। কই দেখাও তার মতো, রবীন্দ্রনাথের মতো, গান্ধীর মতো কোনো লোক আছে কিনা। শিল্প-সাহিত্য-রাজনীতি-অর্থনীতি-বিজ্ঞান কোথাও নাই।
প্রশ্ন : আলোকচিত্রশিল্পী নাসির আলী মামুনকে কিভাবে মূল্যায়ন করেন?
নাসির আলী মামুন : আমি বাংলাদেশের জীবিত অথবা মৃত সকল ফটোগ্রাফারের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদ। আমি সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র, একাকী এবং নিঃসঙ্গ। আমার কোনো বন্ধু নাই। খুব মেধাবী মানুষের কোনো বন্ধু হয় না। কিন্তু মারা যাওয়ার পর তাদের অনেক বন্ধু আসে। আমি মনে করি আমি সেই গোত্রের লোক। যেই গোত্রের মানুষের বন্ধু থাকে না কিন্তু শত্রু অনেক থাকে। আমি গত ৪০ বছরে আমার আশোপাশে দেখছি সব কুমির, সাপ হাঁ কইরা দাঁড়াইয়া আছে। এদের মধ্য দিয়াই আমি ৪০ বছর ধরে প্রবাহিত হইয়া আসছি। ৫টা প্রজন্ম আমার ক্যামেরায় ধরা পড়ছে। বাংলাদেশের মিডিয়াসহ শিল্প-সংস্কৃতি জগত যারা নিয়ন্ত্রণ করে তাদের পার কইরা আমি এতোদূর আসছি। এখনো চলতাছি। এরা হাঁ কইরা তাকাইয়া আছে, কেউ খামচি দিতাছে, কেউ গুলি করতাছে, কেউ মারতাছে...মাইর খাইতে খাইতে এই পর্যন্ত আসছি। এখন আর আমার মৃত্যু নাই।
প্রশ্ন : এই প্রজন্মের ফটোগ্রাফারদের উদ্দেশ্যে কোনো পরামর্শ?
নাসির আলী মামুন : নতুন প্রজন্মের ফটোগ্রাফারদের প্রতি আমার পরামর্শ হইলো- কারো পরামর্শ শুনবেন না।
প্রশ্ন : অবসর সময়ে কি করেন মামুন ভাই?
নাসির আলী মামুন : আমার কোনো অবসর নাই। তুমি আসার আগে আমি কম্পিউটারে কাজ করতেছিলাম। অনেক রাত পর্যন্ত কাজ করছি। আমি এখন ষাট বছরে পড়ছি। চিরদিন তো বাঁইচা থাকবো না। কাজই করতে পারবো আর হয়তো সর্বোচ্চ ১০ বছর। আমি জীবনে যত কাজ করছি নিজের প্রয়োজনে, দেশের প্রয়োজনে সেগুলাকে ক্যাটালগিং করতাছি। ক্যাপশন লেখা, তারিখ দেয়া ইত্যাদি কাজ করতাছি। ৮-১০ বছর লাগবো শেষ করতে। আমি বিদেশে যেহেতু ছিলাম সব ধরণের রান্না করতে হইছে, এখনো করতে পারি। অনেক আন্দজি রান্নাও করছি, ব্যাকরণের মধ্যে পড়ে না আরকি। যেমনÑ ভাজি করছি, তাতে আলু দিছি, ফুলকপি দিছি, সবুজ আপেলও দিছি। অনেকে কইছে, ধুর! এগুলো তরকারি হিসেবে খাওয়া যায় না। কিন্তু যারা খাইছে তারা পুরা খাইছে। আর বই পড়ি। বই না পড়লে বুঝবো কিভাবে হুমায়ূন আহমেদ বত বড় লেখক? আখতারুজ্জামান ইলিয়াস কত বড় লেখক ছিল? জসীম উদ্দীনের লেখার স্টাইল এখনো আদরণীয় কেন?- না পড়লে জানমু কেমনে? তোমাদের মতো হয়তো ওতো পড়ি না, কিন্তু অবশ্যই পড়ি। না পড়লে কিভাবে মানুষ চিনবো?
প্রশ্ন : মামুন ভাই, আপনি কি মনে করেন এই জাতি আপনার যথার্থ মূল্যায়ন করেছে?
নাসির আলী মামুন : আমি বলব না এই জাতি আমাকে মূল্যায়ন করে নাই। কারণ জাতি বললে পুরা ১৬ কোটি লোক বুঝায়। এই ১৬ কোটি লোক কি সচেতন? ১৬ কোটি লোক কি রাত্রে ঘুমাইতে পারে? সবাই কি ভাত খাইতে পারে? ১৬ কোটি মানুষের ঘরে যে ছেলে-মেয়ে আছে, যাদের বয়স ৫ থেইকা ১০ বছর- তারা কি স্কুলে যাইতে পারে? পারে না। কাজেই জাতি বললে অনেক বড় কিছু বুঝায়। এই জাতির মধ্যে সুবিধাভোগী শ্রেণী, স্বার্থান্বেষী শ্রেণী, তথাকথিক শিক্ষিত ও ব্যবসায়ী শ্রেণী এবং মিডিয়া আমাকে মূল্যায়ন করে নাই। তারা আমারে চিনে না। পত্রিকাগুলা আমারে ভয় পায়, আমার কাজরে ভয় পায়। আমি বিকশিত হই তা তারা দেখতে চায় না। আমি যাতে বিকশিত হইতে না পারি সেজন্য হয়তো বাধা দেয় না, কিন্তু সাহায্যও করে না। একটা অদৃশ্য দেয়াল আমার চারদিকে তৈরি করা আছে। তারা আমারে এই দেয়ালে বন্দি দেখতে চায়। কারণ আমি মনে করি যে আমাকে দিয়া অনেক কাজ করাইয়া নিতে পারতো প্রিন্ট মিডিয়া ও প্রকাশনা জগত। সেই কাজ করাইয়া নেয়ার জন্য কেউ আগাইয়া আসে নাই। আমার কাজের মূল্যায়নও তারা করে না। আমার বন্ধু-বান্ধব-পরিচিতরাই শিল্প-সাহিত্যবিষয়ক পত্রিকায় আছে। যে পত্রিকা শিল্পী-লেখকদের সম্মান দেয়, সাক্ষাৎকার নেয়, তাদের সম্পর্কে মূল্যায়নধর্মী লেখা ছাপে। বেশিরভাগ পত্রিকাই আগাইয়া আসে না। ওই প্রদর্শনী হলে নিউজ হয়, ফিচার হইলে হয় না হইলে হয় না। তবে সম্মান দিলে আমাকে দ্য ডেইলি স্টার পত্রিকাই দেয়। পত্রিকাটির ১৫তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে আমার তোলা ছবি এবং আমাকে নিয়া লেখা দিয়া ৫ পৃষ্ঠা ফিচার করছিল। যে ছেলেটা এই কাজটা করছে তার সাথে কোনোদিনও আমার যোগাযোগ ছিল না। ফোনে ফোনে কথা হইছে। আর যারা আমার কাছের তারা আসলে বন্ধুর বেশে, সহকর্মীর বেশে হাঁ কইরা রইছে, অপেক্ষা করতাছে- কখন তাদের মুখের ভিতর দিয়া ঢুইকা আমি তাদের পেটের মধ্যে চইলা যাই। আমার টাকা-পয়সা নাই, গ্রামের মধ্যে থাকি, ঢাকায় কোনো ফ্যাট নাই- কিন্তু আমার যা আছে বাংলাদেশে আর কারো কাছে তা নাই। যে হীরা, মণি-মুক্তা এবং সোনার টুকরা নিয়া আমি বইসা আছি সেগুলা কারো কাছে নাই। আমারে আর্থিক মূল্যায়ন ও সহযোগিতা করলে কি হইতো? আমি হয়তো আরো বেশি মানসিক আনন্দ পাইতাম, আরো বেশি কাজ করতে পারতাম। আমারে তো কেউ আটকাইতে পারে নাই। একটা প্রবাদ আছে- ‘হাতি চালে বাজার কুত্তা ভোকে হাজার।’ হাতি হাতির মতো বাজার দিয়া হাঁইটা যাইতাছে, কুকুর চিল্লানের চিল্লাইতাছে। আর সরকার থাকে তোপখানা রোডের সচিবালয়ে। তারে দেখাও যায় না, ধরাও যায় না। সরকার আমারও ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। সরকারি কোনো পুরস্কার বা পৃষ্ঠপোষকতার জন্য আমি কোনো আবেদনও করি নাই, প্রত্যাশাও করি না। সরকার যদি আমারে চিনতো তেইলে তো অনেক আগেই অন্তত দুএকটা অনুষ্ঠানে ডাকতো। কোনো বড় সরকারি অনুষ্ঠানে আমি আমন্ত্রিত হই না। সরকারি কোনো লোকজনের সাথে আমার কোনো যোগাযোগ নাই। কোনো সরকার আমাকে মূল্যায়ন করে না কারণ কোনো সরকারি-বেসরকারি রাজনৈতিক দলের সাথে আমি নাই, থাকবোও না। কারো প্রতি আমার কোনো সমর্থনও নাই, কোনো দলের প্রতি সরাসরি সমর্থন নাই। রাজনীতি যদিও এই যুগের নিয়তি, তারপরও আমি সরাসরি রাজনীতি করি না। আর কোনো নেতা-নেত্রীর সাথে আমি বৈঠকও করি না, মিশিও না-কাজেই এমন একটা জায়গায় আমি অবস্থান করি যে অবস্থার মানুষকে পাত্তা না দিলেও নেতা-নেত্রীদের কিছু যায় আসে না। কারণ আমি তো তাদের ঘরানার মধ্যে পড়ি না। সরকার তো শুধু শেখ হাসিনা, খালেদা জিয়া না। তারা তো আমাকে বলবে না, “আপনি কি নাসির আলী মামুন? আপনার একটা করা একটা পোরট্রেট নিয়া আসেন, আমরা কিনা নেবো।” এই কাজ করবে শিল্পীদের জন্য যেসব সরকারি প্রতিষ্ঠান বানানো হইছে তারা। যেমন- শিল্পকলা একাডেমী, জাতীয় জাদুঘর, বাংলা একাডেমী। এদেরই তো আগায়া আসা উচিত। তারা এও বলতে পারে, প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেইকা আপনি এই শিল্পীদের ছবি তুলে দেন। বাংলা একাডেমী বর্ধমান হাউসে লেখক মিউজিয়াম করছে। কই একবারও তো বললো না যে, আপনি যে গত ৪০ বছনে লেখকদের ছবি তুলতে তুলতে হয়রান হইয়া গেছেন, অনেক টাকা খরচ করছেন, দেন আপনার ছবিগুলা। ছবিগুলা নিলে তো আমি আর্থিকভাবে লাভবান হইতাম। তবে আমি অবশ্যই বাংলা একাডেমীর কাছে কৃতজ্ঞ- তারা ৬ বার আমার একক প্রদর্শনীর আয়োজন করছে।
প্রশ্ন : মামুন ভাই, আজ তাহলে শেষ করি? আর কিছু বলতে চান?
নাসির আলী মামুন : শেষে শুধু এটুকু বলতে চাই, আমি এতোদিন যা করছি নিজে নিজে করছি। কেউ আইসা একটা লজেঞ্জ আমারে দেয় নাই। আমি যতদূর আসছি পুরাটাই নিজের চেষ্টায়, নিজের শক্তিতে, নিজের জ্ঞানে আসছি। আমাকে কেউ বিকশিত হওয়ার জন্য তুইলা ধরে নাই। উল্টা দাবানোর জন্য নানা রকম চেষ্টা করছে।
আমাকে সময় দেয়ার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ মামুন ভাই।
নাসির আলী মামুন : তুমি কষ্ট কইরা আমার কাছে আসছো, কথা বলছো তাই তোমাকেও ধন্যবাদ। ভালো থাকো।
প্রকাশকাল : ২৬ অক্টোবর ২০১২, সাপ্তাহিক ২০০০, ঈদুল আজহা সংখ্যা ২০১২
সাক্ষাৎকার গ্রহণের তারিখ: ১৯ জুলাই, ২০১২
| © সুদীপ্ত সালাম |
প্রশ্ন : মামুন ভাই শুরুর কথা শুনি? আপনার জন্ম তো ঢাকাতেই?
নাসির আলী মামুন : এতো কথা কইতে গেলে তো দেরি হইয়া যাইবো। তারপরও আমি খুব সংক্ষেপে বলি। আমার জন্ম হইছি৬েলা ১৯৫৩ সালের পহেলা জুলাই পুরনো ঢাকার মৌলভীবাজারে। তখন মৌলভীবাজার ছিল বিরাট এক বাজার। মৌলভীবাজারে একটা পুরনো দোতলা বাড়িতে তহন আমরা ভাড়া থাকতাম। আমার বাবা হাইকোর্টে চাকরি করতো। পুরান ঢাকা এলাকাতেই আমার শিশুকাল কাটছে। ঢাকাইয়া কুট্টিদের মতন আমি তখন কথা কইতাম। কথা বলা যখন আমি শিখছি তখন থেইকাই ঢাকাইয়া কুট্টিদের মতন কইরা কথা বলার চেষ্টা করতাম। শুধু ভাষাই না, আচরণও ওদের মতন ছিল। ছোটবেলায় নাকি অনেক গালিটালি দিতাম। আমার মনে নাই, আব্বা-আম্মার কাছ থেইকা শুনছি । আমার স্কুল জীবন শুরু হওয়ার আগে আমরা থাকতাম হাইকোর্ট এলাকায়- নতুন হাইকোর্ট এখন যেইখানে সেইখানে আগে কোয়াটারের মতো অনেক বিল্ডিং ছিল, আমি বলতাছি এখন থেইকা ৫৬-৫৭ বছর আগের কথা- তখন সাবেক পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম চিড়িয়াখানা ছিল এখন যেখানে হাইকোর্ট আছে ওই জায়গাটায়। আর ওইখানে একটা বড় পুকুরের মতন ছিল, সেখানে ছোটবেলায় আমরা মাছ ধরতাম, গোসল করতাম। প্রচুর গাছগাছালি ছিল হাইকোর্ট এলাকায়। আসলে ঢাকায় আগে এতো গাছ ছিল যা এখন কল্পনার মতন। যখন অনেক ছোট ছিলাম তখন হাঁইটা হাঁইটা বন্ধুদের সাথে বিভিন্ন জায়গায় গেছি, কিছু কিছু স্মৃতি তো মনে আছে। আমাদের বাসার পেছন দিকে ছিল রেসকোর্সের ময়দান। আমার জানামতে তখন সপ্তাহে দুদিন রেস হইতো। রোববারে হইতো সেটা মনে আছে। বহুলোক দেখতে আসতো। যারা ঘোড়দৌড় করতো তাদের বিভিন্ন রঙের পোশাক ছিল। আমরা পিছনে দাঁড়াইয়া দেখতাম। কাঠের রেলিং দিয়া পুরা ময়দানটা ঘেরা থাকতো। সেই ময়দান এখন সোহরাওয়ার্দী উদ্যান। ব্রিটিশ আমলে নাকি এইখানে পোলো খেলা হইতো। আমার জীবনের প্রথম ঘোড়দৌড় আমি ওই মাঠেই দেখছি। বড় বড় রাজনৈতিক অনুষ্ঠান তখন পল্টন ময়দানেও হইতো রেসকোর্স ময়দানেও হইতো। ওই জায়গায় পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর আজম খানও কি একটা মিছিল করতে আসছিল। যাইহোক রেসকোর্স এলাকা, হাইকোর্ট এলাকায় প্রচুর পাখি ছিল। বানর ছিল, শিয়াল ছিল, সজারু ছিল। আমরা ছোটবেলায় সজারুর কাঁটা টোকাইতাম। অনেকটা বনাঞ্চলের মতোই ছিল। ৫৬, ৫৭, ৫৮ বছর আগে এরকম আরবান ঢাকা তো ছিল না। ঢাকা একটা মহকুমা শহরের মতই ছিল। হাইকোর্টে থাকতে প্রচুর পাখি দেখছি। ঝাউগাছ, ঝাউগাছের গর্তে টিয়াপাখি থাকতো। আরো বড় বড় লেজওয়ালা অনেক পাখি দেখছি। সেসব পাখি পরবর্তীকালে মানে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরে উধাও হইয়া গেছে। কারণ এতো লোকজন হইয়া গেছে বাংলাদেশে! গত ত্রিশ বছরে ঢাকা থেইকা গাছ হারাইছে, পাখিও হারাইছে। আমরাই এগুলারে হত্যা করছি। নিজের চোখের সামনে ঢাকা শহরটা বাইড়া উঠতে দেখছি। মতিঝিল এলাকা, ধানমন্ডি, গুলশান-বনানী সবই চোখের সামনে বাইড়া উঠছে। আমি যেইভাবে বাইড়া উঠছি আস্তে আস্তে, ঢাকার আরবানাইজেশনও একই সাথে বাইড়া উঠছে। রাজধানী যে বিকশিত হইতাছে তাও আমার চোখের সামনে হইছে।
প্রশ্ন : পড়াশোনা কোথায় করেছেন?
নাসির আলী মামুন : আমি প্রথমে পড়ছি হইলো আজিমপুর কিন্ডারগার্ডেন স্কুলে। তারপর কলাবাগানের একটি স্কুলে আসছি। তারপর কিছুদিন বাসায়ই ছিলাম। তারপর ধানমন্ডির মহামেডান স্কুল। শেষে ঢাকা কলেজে।
প্রশ্ন : আপনার পরিবার সম্পর্কে কিছু বলুন?
নাসির আলী মামুন : আমার স্ত্রী নাজমা। বিয়ে করছি ২৮ বছর হয়ে গেছে। নাজমা গৃহিনী। আমাদের পারিবারিক বিয়ে। প্রথমে দুজনের মধ্যে জানাশোনা ছিল। আমাদের দুছেলে। একজনের নাম অন্যতম, আরেকজন রেশাদ। রেশাদ পালিত পুত্র কিন্তু কখনো নিজের ছেলের চেয়ে কম মনে করি নাই। অন্যতম এবার অনার্স দিলো। ফটোগ্রাফিতে ওরে বেশি উৎসাহ দেই না, বাধাও দেই না। ওর যা ইচ্ছা ও হোক।
প্রশ্ন : ফটোগ্রাফি শিখেছেন? মানে কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির কাছ থেকে?
নাসির আলী মামুন : আমি কোনো জায়গায় ফটোগ্রাফির ট্রেনিং নেই নাই। কিন্তু একজনের কাছে শিখছি যে এক্কেবারে আনকোড়া ছিল। সে খুব ভালো জানতো তা না। কিন্তু ফটোগ্রাফির প্রতি তার আগ্রহ ছিল, কিছু ধারণা ছিল। সে আর কেউ না-আমি নিজেই নাসির আলী মামুন। আমার ছবি তোলার কোনো গুরু নাই। আমি নিজেই নিজের শিক্ষক। নিজের কাছে নিজে প্রশ্ন করতাম। নিজেই উত্তর দিতাম। দেখতাম সেই উত্তর সঠিক হয়ে গেছে। যেমন-অ্যাপারচার। আমি আন্দাজ করতাম এই আলোতে কত অ্যাপারচার দিলে সঠিক এক্সপোজার পাওয়া যাবে। পরে যখন ডেভলপ করতে যাইতাম দেখতাম আমার আন্দাজই ঠিক। অনেকের কাছে গিয়ে যে শিখি নাই তা না। দুএকটা সমস্যা দেখা দিছে, যেমন- শাটারস্পিড আসলে কি? তখন বলা হইতো-শাটারস্পিড মানে কত সময় নিয়া ক্যামেরার মধ্যে আলো ঢুকবে। এখন তো ডিজিটালের যুগে সেই প্রশ্নের বালাই নাই। এখন ক্যামেরায় টিপ দিলেই ছবি আসে। আমার মনে হয় না অ্যাপাচার শিখার জন্য এখন আর ফটোগ্রাফারকে সময় নষ্ট করার প্রয়োজন আছে। আমি যাদের কাছে কিছু কিছু বিষয় শিখতে যেতাম তারা বেশিরভাগই ছিল বিহারী। তারা ছিল স্টুডিওর ফটোগ্রাফার। কিভাবে ফিল্ম ডেভলপ করে, প্রিন্ট করে এগুলো তাদের কাছ থেকে জানছি। ’৬৯-’৭০ সালে মানে পাকিস্তানি আমলে ঢাকায় যে বিহারী ফটোগ্রাফাররা ছিল এবং বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরেও যারা কাজ করছে তাদের কাছ থেকে অনেক কিছু শিখেছি। পাকিস্তানি আমলে আমি ফটোগ্রাফার হই নাই, কিন্তু ক্যামেরা হাতে নিছি। এই বিহারী ফটোগ্রাফাররা ছিল ঢাকার মিরপুর, মোহাম্মদপুরের। বিহারীগো আস্তানাই তো ছিল এসব এলাকা। ওদের সাম্রাজ্য আরকি। তুমি তো জানোই ’৭১ সালে ওরা কি করছে! যাইহোক। ওরা ওইখান থেইকা আসতো কাজ করতে। গ্রিনরোড এলাকায় আমি থাকতাম। গ্রিনরোড এলাকায় ‘নেহার’ নামে একটি স্টুডিও ছিল। আমার জানা মতে, ’৬৪ সালে এই স্টুডিওটি প্রতিষ্ঠিত হয়। ওই এলাকার সবচেয়ে পুরনো স্টুডিও। যা এখন আর নাই। ওই স্টুডিওর বিহারী কর্মচারী যারা ডার্করুমে কাজ করতো তাদের কাছ থেইকাও অনেক কিছু শিখছি।
প্রশ্ন : কিভাবে ফটোগ্রাফি শুরু করলেন?
নাসির আলী মামুন : ১৯৬৭ সালে আমি প্রথম ক্যামেরা হাতে পাই। আমার এক বন্ধু ছিল, ঢাকার নবাববাড়ির নবাব সলিমুল্লাহ হইলো তার আপন নানা। সে এখনো জীবিত। গ্রিনরোডে থাকতো ওরা। তার নাম হইলো খাজা মোহাম্মদ হারিস আদিল। খাজা হারিসের কাছ থেইকা আমি প্রথম ক্যামেরা নেই। সে ফটোগ্রাফি জানতো না। তার বোন লন্ডন থেইকা অনেকগুলা খেলনার সাথে একটা ক্যামেরা পাঠায়। ক্যামেরার চোখ দিয়ে দেখার জন্য কোনো ভিউফাইন্ডার ছিল না। আন্দাজ কইরা ছবি তুলতে হইতো। শুধু ছবি তোলার একটা লেন্স ছিল। সেই প্লাস্টিকের ক্যামেরার মধ্যে যে ফিল্ম ভরতাম সে ফিল্ম থার্টি ফাইভ ও ওয়ান টুয়েন্টির মাঝামাঝি ফরম্যাটের ছিল। স্বাধীন বাংলাদেশে এই ফরম্যাটের ফিল্ম আমি আর পাই নাই। খেলনা ক্যামেরা, ছবি উঠতো একটু সফ্ট, আউট-অব-ফোকাস-তাতেই মহাখুশি। কি ছবি তুললাম? কোনো ল্যান্ডস্কেপ না। বাংলাদেশের যেকোনো আলোকচিত্রশিল্পী প্রথম ক্যামেরা হাতে পাইয়াই তাদের সামনের ল্যান্ডস্কেপ, ফুল, পাখির ছবি তোলে। আমি কিন্তু সেদিকে গেলাম না। এধরনের একটা ছবিও তুললাম না। আমি তুলছি আমার বন্ধু-বান্ধব, ভাই-বোনদের ছবি। পরে অবশ্যই হারিসের বোন ওর জন্য আরো একটি ক্যামেরা পাঠাইছিল। ওটার আবার ভিউফাইন্ডার ছিল। ক্যামেরার নাম ‘লুবিটেল’। যতদূর মনে পরে ক্যামেরাটি ১৯৬৮ সালে পাঠানো হয়েছিল। সেটা দিয়েও ছবি তুলেছি। সেটা ছিল ওয়ান টুয়েন্টি ফিল্ম ক্যামেরা। আমার অরেক বন্ধু আশফাক। ধানমন্ডির সরকারি স্কুলে আমরা একসাথে পড়তাম। আশফাকের ক্যামেরা দিয়েও আমি ’৬৮-’৬৯ সালে অনেক ছবি তুলছি। ওইটা ছিল থার্টি ফাইভ মিলিমিটারের ক্যানন ক্যামেরা। একটা ফিল্ম কিনলে ৭২টা ছবি নেয়া যেতো। তখন থেইকাই পোরট্রেটের প্রতি আগ্রহ ছিল। তখন কিন্তু জানতাম না পোরট্রেট ফটোগ্রাফি কি। ফটোগ্রাফার হবো সেই বাসনা মনে ছিল সত্য কথা। পরবর্তীকালে ’৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ যখন হইয়া গেল তখন সারা দেশেই একটা অস্থির অবস্থা বিরাজ করছিল। নতুন দেশ, নতুন জাতি, নতুন ভাষার মানুষ আমরা। আগে পাকিস্তানের অংশ ছিলাম। স্বাধীনতার পর হইলাম এক জাতি, এক দেশ, এক ভাষার মানুষ। তখন দেখলাম চারিদিকে কাজ করা শুরু হইয়া গেছে। তরুণরা কাজ করার রাস্তা খুঁজতাছে। তখন দেখলাম যে আমি যদি আমার রাস্তা এখন ঠিক না করি তাহলে বিভ্রান্ত হইয়া যাবো, কোনো কাজই করতে পারবো না। এখনই আমার বড় সুযোগ একটা কিছু করার। কিন্তু ফটোগ্রাফি ট্রেনিং আমার নাই। নিজের ক্যামেরাও নাই। তখন খোঁজ নেয়া শুরু করলাম কাদের কাছে ক্যামেরা আছে। তখন অল্প কিছু পরিবারে ক্যামেরা ছিল। আমাদের একটা কাব ছিল- নবারুণ কিশোর সংঘ। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়া পর্যন্ত সে কাব ছিল। এটি কোনো ফটোগ্রাফির কাব ছিল না। এটি ছিল খেলাধুলার কাব। আমি আজীবন কাবের ক্যাপ্টেন ছিলাম। অনেক বিহারী বন্ধুও এই কাবের সদস্য ছিল। ওরা ভালো ছিল, নিরীহ বিহারী আরকি। মুক্তিযুদ্ধের সময় ওরা সব চইলা গেল। স্বাধীনতার পর বন্ধুরা বিচ্ছিন্ন হইয়া গেলাম, গ্রিনরোড এলাকা ছাইড়া অনেকে অন্য জায়গায় চইলা গেল, আমরাও অন্য জায়গায় চইলা গেলাম- ফলে ক্লাব আর টিকলো না। ১৯৬৫ সালে কাবটা শুরু করছিলাম। আমাদের সঙ্গে তখন খেলছে মুক্তিযোদ্ধা আবদুল আজিজ। মুক্তিযুদ্ধের সময় সে ঢাকা সিটি কমান্ডার ছিল, তার আগে ঢাকা কলেজের ভিপি ছিল। আরো ছিলেন লেফটেনেন্ট বাবুল ভাই। তিনি মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হন। তারা গ্রিনরোড স্টাফ কোয়ার্টারে থাকতেন, আমাদের প্রতিবেশী ছিলেন। আরো অনেক মুক্তিযোদ্ধা বড়ভাই আমাদের কাবে খেলছেন। আমাদের অনেক উৎসাহ দিতেন। যাইহোক- আমি তখন ফটোগ্রাফার হতে ক্যামেরা খুঁজতে লাগলাম। বন্ধু আশফাকের কাছ থেইকা ক্যামেরা ধার নিতাম। আমার আরো বন্ধু-বান্ধব ছিল। খুব জটিল অবস্থা ছিল। অনেক বন্ধুর কাছ থেইকা ক্যামেরা নিতাম কিন্তু ক্যামেরার মালিক বন্ধু ছিল না। ক্যামেরার মালিক ছিল কারো কারো দাদা। এরকম একজনের কাছ থেইকা ক্যামেরা নিতাম- যার দাদা ছিল ক্যামেরার মালিক। ধানমন্ডিতে থাকতো। আমার স্কুল ফ্রেন্ড। তাদের ক্যামেরা আলমারিতে একটা লাল মখমলের কাপড়ে মোড়ানো থাকতো। ফক্টল্যান্ডার ক্যামেরা। অস্ট্রিয়ান ওয়ান টুয়েন্টি ক্যামেরা। ৮টা এক্সপোজার দিতো। সে ক্যামেরা দিয়া ফোকাস করা যাইতো না। দূরত্ব অনুযায়ী ফোকাস করতো। একটা ফিতা রাখতাম, ১ ফিট, ২ ফিট, ৩ ফিট। যার ছবি তুলতাম তার মুখ থেইকা ক্যামেরা লেন্স পর্যন্ত ফিতা দিয়ে মাপতাম। যত ফিট হইতো তত ফিট লেন্সের সামনের রিং ঘুরাইয়া সেট করে দিতে হইতো। এই ভাবে ধার করা ক্যামেরা দিয়া, এতো কষ্টের মইধ্যে আমি ছবি তুলতাম। অ্যাপারচার ব্যাপারটা আমি শিখছিলাম শুরু দিকেই। ক্যামেরা হাতে নেয়ার এক থেকে দেড় বছরের মধ্যে। অনেক ফটোগ্রাফার ৮-১০ বছরেও ম্যানুয়াল ক্যামেরার অ্যাপারচার জানতো না। তখন তো লাইট মিটার ছিল না। আমি নিজে নিজে বিভিন্ন পরিমাণ আলোয় ছবি তুলে তুলে প্র্যাকটিস করতাম। সাদা-কালো ফিল্ম ডেভলপ করে দেখতাম ৯৯ ভাগ সময়ে ছবি ঠিক আসতো।
প্রশ্ন : পোরট্রেটই কেন বেছে নিলেন এবং কিভাবেই বা তা করা শুরু করলেন?
নাসির আলী মামুন : ছবি তোলা শুরু করলাম। কিন্তু কি ধরনের ছবি তুলবো? আমি দেখলাম আমার আগের ও সমসাময়িক ফটোগ্রাফাররা প্রায় সবাই প্রকৃতিনির্ভর ছবি তোলে। কিন্তু কে নো একটা বিশেষ বিষয়ের প্রতি তাদের ফোকাস নাই। আমি ভাবলাম সবাই যেদিকে যায় সেদিকে আমি যাবো না। দেখলাম কি কি খালি আছে। দেখলাম পোরট্রেট ফটোগ্রাফি বাংলাদেশে নাই। তখন পোরট্রেট ফটোগ্রাফি বলতে বুঝতো স্টুডিওতে গিয়া ছবি তুইলা আসা। এটা যে একটা বিষয় হতে পারে সেটাও কেউ জানতো না। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম আমি পোরট্রেট তুলবো। কাদের? যারা বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিখ্যাত লোক। বিখ্যাত লোকদের প্রতি আমার ভালোবাসা ছিল। শুরু করলাম পোরট্রেট ফটোগ্রাফি। কিন্তু বিখ্যাত লোকদের ঠিকানা জানি না। তারওপর নাই ট্রেনিং। বাংলা একাডেমীতে গেলাম ওরা একটা ছোট তালিকা করে দিলো। যেই বিখ্যাত মানুষের কাছে যাই তার কাছ থেইকাও বিখ্যাত মানুষের নাম চাই। কেউ কেউ দিলো, কেউ কেউ উপহাস করলো। আবার কেউ আমার তালিকা দেইখা বলে “আরে! আমি ছবি তুলবো না। তোমার তালিকায় অমুক লোকের নাম আছে। তুমি এর ছবি তুলছো?” যদি বলতাম, “হ্যাঁ তুলছি।” তখন হয়তো বলতো- “না, আমি ছবি তুলবো না, আমি তো এর দুই বছর আগে থেকে কবিতা লিখি। তুমি তার ছবি আগে তুলছো, আমারটা পরে তুলতাছো!” আবার অনেকে বলতো, “আরে! এতো ছাগল। তুমি এর ছবি তুলছো!” যাইহোক এরকম করতে করতেই ৫-৬ বছরে আমার প্রায় ৫শ ব্যক্তির একটা তালিকা দাঁড়াইলো। ৬৬জন কবি-সাহিত্যিকের পোরট্রেট নিয়া ১৯৭৭ সালে আমি প্রথম প্রদর্শনী করলাম, বাংলা একাডেমীর বইমেলায়। ছবির সাইজ ছিল ১০/১২-এর অর্ধেক। তখন তো অন্য কোনো কাজ করি না। বিশিষ্ট বেকার। সেসময় ছবি কেউ বুঝেও না, কেউ কিনেও না। পোরট্রেট যে শিল্প হতে পারে তা লেখকরাও বুঝতো না। প্রদর্শনীর আয়োজকও ছিল বাংলা একাডেমী। উদ্বোধন করছিলেন প্রেসিডেন্ট জিয়াইর রহমানের তথ্য উপদেষ্টা আকবর কবীর। তখন তো সামরিক শাসন। ফরিদপুরের আকবর কবীর ছিলেন ভারতের শিক্ষামন্ত্রী ও কবি হুমায়ুন কবীরের আপন ছোট ভাই। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কবি শামসুর রাহমান। শামসুর রাহমান প্রদর্শনী উদ্বোধনের দিনই অর্থাৎ ১৬ই ফেব্রুয়ারি দৈনিক বাংলার সম্পাদক হইছিলেন। আরো ছিলেন বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক ফোকলোর গবেষক ড. আশরাফ সিদ্দিকী। প্রদর্শনী চললো- ১৬ ফেব্রুয়ারি থেইকা ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। প্রদর্শনী দেখতে বহুলোক আসছে। কবি আহসান হাবীব, শামসুর রাহমান প্রথম দিনই দেইখা গেছে, রাজশাহী থেইকা কবি বন্দে আলী মিয়া আসছিল। বাংলা একাডেমী ভবনের চতুর্থ তলায় প্রদর্শনীর আয়োজন করা হইছিল। ছবিগুলো ছিল বোর্ডে লাগানো। কবি সুফিয়া কামাল আসছিলেন কিন্তু উপরে উঠতে পারছিলেন না, কারণ ওনার হার্টে সমস্যা ছিল। কবি আবদুস সাত্তার সুফিয়া কামালকে কোলে করে প্রদর্শনী দেখতে নিয়া গেলেন। আর হাল আমলের প্রায় সবাই আসছিলেন- কবি বেনজীর আহমেদ, কবি মঈনুদ্দীন, অসীম সাহা, মহাদেব সাহা, রফিক আজাদ, আসাদ চৌধুরী, সেলিনা হোসেন এরা সবাই আসছিলেন। প্রবীণ সাহিত্যিকরা খুব অ্যাপ্রেশিয়েট করছে, কিন্তু নবীনদের অনেকে অসন্তুষ্ট হইছিল যেহেতু প্রদর্শনীতের তাদের ছবি ছিল না। রফিক আজাদ ভাই মন্তব্য খাতায় লিখছিল- “অনেক ছবি দেখলাম, ভালো লাগলো। কিন্তু বেশিরভাগ ছবিই মৃত-মুমূর্ষুদের।” ভালো লিখছে, আমি খুব এনজয় করি। যাইহোক, এই প্রথম প্রদর্শনী হইলো। পোরট্রেট ফটোগ্রাফিতে মন দিলাম। তখন পেশা না। পয়সা আয় করলেই না পেশা। তখন নেশাই।
প্রশ্ন : ফটোগ্রাফিই করবেন এমনটি মনে হলো কেন?
নাসির আলী মামুন : আমি ফটোগ্রাফিটাকে বেছে নিছি কারণ আমার মনে হইছিল আমি অন্য কিছু হইতে পারবো না। আমার চেহারা ভালো না যে অভিনয় করবো, গলা ভালো না যে আবৃত্তি করবো। চেষ্টা করলে ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার নিশ্চয় পারতাম, আমি উদ্যোমী লোক, মেধাবী লোক। হই নাই,কারণ আমি এমন একটা দিকে যাইতে চাইছি যেদিকে নতুন কিছু করা সম্ভব। দেখলাম- আমি যদি আলোকচিত্রী হই তাহলে বাংলাদেশে পোরট্রেট ফটোগ্রাফির সূচনা করতে পারবো। ১৯৭২ সালে সূচনা আমি করছি। আমার হাত দিয়া পোরট্রেট ফটোগ্রাফি জন্ম হইছে এই দেশে। তার আগে কেউ করে নাই? পোরট্রেটকে ব্যতিক্রম মনে কইরা কেউ করে নাই। কিন্তু শিল্পকলার বিষয় হিসেবে প্রথম আমি পোরট্রেট ফটোগ্রাফি চালু করছি এই দেশে।
প্রশ্ন : একজন ফটোগ্রাফার হিসেবে ফটোগ্রাফিকে কিভাবে ব্যাখ্যা করেন?
নাসির আলী মামুন : ফটোগ্রাফি ওই মানুষরা করে যারা পৃথিবীর সবচেয়ে বুদ্ধিমান মানুষ। আমি বলছি না আলোকচিত্রীরা সবার উপরে, কিন্তু অন্যান্য শিল্পীদের তুলনায় আলোকচিত্রশিল্পীরা বেশি বুদ্ধিমান। তারা চৌকষ ও মেধাবী। আমরা কি দিয়া ছবি তুলি? ক্যামেরা নামক যন্ত্রের মাধ্যমে ছবি তুলি। আমরা এই যন্ত্রটারে কলম বানাই, পেন্সিল বানাই, তুলিও বানাই। আবার হারমোনিয়াম বানাই, সেতার বানাই, ভায়োলিন বানাই, বাঁশিও বানাই। এই ক্যামেরাটার ওপরে আমরা ভরসা করি না। ক্যামেরার সাথে আমরা এমন এক প্রেমের সম্পর্ক স্থাপন করি, যে সম্পর্ক প্রেমিক-প্রেমিকার মধ্যে হয়Ñ সে সম্পর্কই একজন প্রকৃত আলোকচিত্রশিল্পী ক্যামেরার সাথে স্থাপন করে। করে বইলাইতো আলোকচিত্রী ক্যামেরা দিয়া এমন সব ছবি তোলে সেগুলো জাদুঘরে স্থান পায়। পশ্চিমা দেশগুলোর জাদুঘরে চিত্রকর্মের পাশাপাশি আলোকচিত্রও রাখা হয়। কি অসাধারণ সব ছবি! পিকাসে-মার্তিস-ব্রাকের চিত্রকর্মের সাথে আলোকচিত্রকর্ম কেন রাখছে তারা? কারণ তারা মনে করে উভয়ই শিল্প। আমাদের দেশের মানুষ যথেষ্ট শিক্ষিত না। কাজেই এদেশে আলোকচিত্রকলা তেমন বিকশিত হয় নাই এবং আদর্শশিল্প হিসাবে দাঁড়াইতে পারে নাই। আলোকচিত্রীরা অনেক বড়। সে একটা যন্ত্ররে ভাইঙা তুলি বানাইতাছো, কলম বানাইতাছো- এইটা সোজা কথা না। একটা ধাতব জিনিসকে কিভাবে তরল করে ফেলতাছে! এই কাজটা কারা করতে পারে? যারা অনেক বড় বিজ্ঞানী, বড় চিন্তাবিদ, বিরাট মেধাবী। আমরা আলোকচিত্রশিল্পীরা সেই শ্রেণীর মানুষ। আমাদেরকে সেভাবে কি মূল্যায়ন করা হয়? পশ্চিমা দেশে করা হয়। আর বাংলাদেশে করা হয় অবমূল্যায়ন। যে দেশে মুড়ি আর মুড়কির একই দাম সে দেশে আর কি আশা করবা? ১৬ কোটি মানুষের মধ্যে কত লোক শিক্ষিত? তুমি বলবা- পরিসংখ্যান তো বলে ৬৫ শতাংশ মানুষ শিক্ষিত। ১শ’র মধ্যে ৬৫জন স্বাক্ষর করতে পারে। আমার তো মনে হয়- যারা একটু-আধটু পড়তে পারে, একলাইন লিখতে পারে তাদের সংখ্যা ২০ শতাংশের বেশি না। রুচিশীল না বইলা এই মানুষগুলোকে দোষও দেই না। তারা রুচিশীল না, কারণ তারা দরিদ্র ও শিক্ষিত না। ফলে তারা স্বপ্নও দেখতে পারে না। কিন্তু এদেশের শিক্ষিত শ্রেণীকে দোষ দিই। এরা ছবি আঁকে, গান করে, শিক্ষক, মিডিয়াকর্মী- কিন্তু আলোকচিত্রশিল্পীদের বাঁদিকে রাখে। তারা আলোকচিত্রশিল্পীকে ‘কামলা’ মনে করে। ঢাকার একটা দৈনিক পত্রিকার সম্পাদক আমার সামনেই ফটোসাংবাদিকদের কামলা বলতো। তারা নাকি কামলাগিরি করে। শব্দটা অশ্লীল। এভাবে আলোকচিত্রীদের ছোট করা হয়। এই দেশে ফটোগ্রাফি করা মানে ধারালো কিছু দিয়া নিজের শরীর কাইটা রক্ত ঝরানো। তাই আমি করতাছি, আমরা করতাছি। আনন্দের সাথে করতাছি।
প্রশ্ন : পোরট্রেট ফটোগ্রাফিকে কিভাবে ব্যাখ্যা করেন?
নাসির আলী মামুন : ফটোগ্রাফির শত শত বিভাগ আছে। তারমধ্যে পোরট্রেট ফটোগ্রাফি সবচেয়ে উচ্চ শিখরে অবস্থা করছে। এভারেস্টে পোরট্রেট ফটোগ্রাফি বইসা আছে। কারণ ফটোগ্রাফির নির্যাস হইলো পোরট্রেট ফটোগ্রাফি। যারা পোরট্রেট ফটোগ্রাফার তারা সবচেয়ে বুদ্ধিমান, সবচেয়ে মেধাবী। কারণ তারা যাদের ছবি তোলে তাদের ব্যক্তিত্ব, চরিত্র এবং তাদের প্রাণটা ছবির মধ্যে তুইলা ধরে। অনেক পোরট্রেট ফটোগ্রাফার আছে যাদের তোলা ছবি দেখলে মনে হবে, মডেলের চোখ নড়তাছে, কথা বলতাছে, সে শব্দ করতাছে, গান করতাছে, কবিতা আবৃত্তি করতাছে- এইখানেই ফটোগ্রাফারের মুনশিয়ানা। ওই প্রাণ যে দিতে পারে সে কত বড় বুদ্ধিমান!
প্রশ্ন : মামুন ভাই, আপনার ফটোগ্রাফি করার পেছনে কোনো অনুপ্রেরণা কাজ করেনি?
নাসির আলী মামুন : অনুপ্রেরণা পাইছি। অনুপ্রেরণা ছাড়া কিভাবে হবে? প্রথমে অনুপ্রেরণা পাইছি পত্র-পত্রিকায় ছাপা হওয়া বিখ্যাত লোকদের ছবি দেইখা। তখন আমি ফটোগ্রাফির কোনো বই দেখি নাই। এগুলো কোথায় পাওয়া যায়, ব্রিটিশ কাউন্সিল কোথায়- এসব কিছুই জানতাম না। পরে আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে এগুলো আমি জানছি, বই দেখছি। সেসময় ব্রিটিশ কাউন্সিলের লাইব্রেরিতে কিছু বই দেখছি। পরিচিতদের বাসায় গিয়া বই পাইছি। ফটোগ্রাফিক ম্যাগাজিন দেখছি। ততদিনে আমার নিজস্ব স্টাইল গ্রো করছে। গ্যাটে ইনস্টিটিউটে কিছু জার্মান বই দেখছি।
প্রশ্ন : শুধু তো বাংলাদেশের বিখ্যাত ব্যক্তিদের ছবিই তোলেননি? আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বহু ব্যক্তির ছবি...
নাসির আলী মামুন : ’৬৩-’৬৪ সাল থেইকা আমি বিদেশি বিভিন্ন পত্রিকা থেইকা ছবি কাটতাম। সেসব খবরের কাগজে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, সাহিত্যিক ও অন্যান্য বিখ্যাত লোকদের যেসব ছবি ছাপা হইতো আমি সেগুলো দেখতাম। আর আমি আফসোস করতাম- এধরনের ছবি আমি নিজে কোনোদিন কি তুলতে পারবো না? কারা এসব ছবি তোলে? নিশ্চয় কোনো ফটোগ্রাফার? সে ক্যামেরা নিয়ে কিভাবে এই বিখ্যাত লোকের সামনে গেছে? কিভাবে তার সাথে কথা বলছে? আমাদের বাসায় ইংরেজি খবরের কাগজ আসতো। মর্নিং নিউজ আর অবজারভার। অবজারভারের একটা ট্যাবলয়েড সাইজের ম্যাগাজিন বের হইতো- সানডে। ওই ম্যাগাজিনের কভারে অসাধারণ সব পোরট্রেট ছাপা হইতো। আমানুল হকের ছবি দেখতাম, নাইব উদ্দিন আহমেদের ছবি দেখতাম, ড. নওয়াজেশ আহমেদের ছবি দেখতাম। তাদের ছবি দেইখা বিস্মিত হইতাম- এরা বাংলাদেশের ফটোগ্রাফার! তাদেরকে তখন চিনতাম না। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরে এদের আমি ভক্ত হইয়া যাই। তাদের সাথে আত্মিক সম্পর্ক হয়। খুব ভালো সম্পর্ক হয় তাদের সাথে। খবরের কাগজের পাতা থেইকা আমি বিখ্যাত লোকদের ছবি কাইটা রাখতাম। আব্বা পত্রিকা পড়ার আগেই আমি কাইটা ফেলতাম। এইজন্য মাইরও খাইছি। বিখ্যাত লোকদের ছবি আমি কাটতাম, কারণ বিখ্যাতদের প্রতি আমার দুর্বলতা ছিল। তাদের কাজকর্ম দেখে, তাদের লেখা পড়ে, তাদের কথা শুনে, তাদের ছবি দেখে তাদের প্রতি আগ্রহ জন্মায়। তখন পাকিস্তানি সরকারি টিভি ছাড়া আর কোনো টেলিভিশন ছিল না। অনেক অভিনেতা-অভিনেত্রী যাদের দেখে ভালো লাগতো তাদের অনেকের সাথে পরে দেখা হয়েছে। তাদের মধ্যে একজনের সাথে ২০০৯-এ দেখা হয়, আমি তার ভীষণ ভক্ত ছিলাম। বলাকা সিনেমা হলে তার ছবি দেখতে গেছিলাম। তার নাম সিডনি পয়েটিয়ার। উনি কৃষ্ণাঙ্গ। তিনি প্রথম ব্ল্যাক যিনি ১৯৬৩ সালে অস্কার অর্জন করেন। ২০০৯ সালে তার বয়স প্রায় ৮০। হোয়াইট হাউসে তার সাথে আমার দেখা হয়। ইউনূস স্যারের সাথে আমি গেছিলাম। আমেরিকার সর্বোচ্চ বেসামরিক খেতাব ‘প্রেসিডেন্সিয়াল মেডেল অব ফ্রিডম’ গ্রহণ করতে ইউনূস স্যার গেছিলেন। সেই মেডেল প্রদান অনুষ্ঠানে আমার সাথে সিডনি পয়েটিয়ার আর স্টিফেন হকিংসের দেখা হয়। সিডনি পয়েটিয়ারের কথা বললাম কারণ- এই অভিনেতাকে একসময় স্বপ্নে দেখতাম। এতো ভালো অভিনয় করতো। অবজারভারে ঔপন্যাসিক নরম্যান মেইলারের ছবি দেখছি। আমেরিকায় তার সাথে আমার কয়েকবার দেখা হইছে। দুইবার আমি তার পোরট্রেটও তুলছি। এরকম অনেকে আছে- কবি অ্যালেন গিন্সবার্গ। পত্রিকায় তার ছবি দেখছি। পরে ৫ বছর তার সাথে আমেরিকায় মিশা আসছি। ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। তিনি নিজে স্বীকার করতেন- আমি তার বন্ধু ছিলাম। কবি নির্মলেন্দু গুণের সাথে গিন্সবার্গের দুদফায় কয়েকবার দেখা হইছে, গুণদা’ দেইখা আসছে আমাদের মধ্যে কি নিবিড় সম্পর্ক ছিল। গিন্সবার্গের কল্যাণে অনেক লেখকের ছবি তোলার সুযোগ পাইছি। আমি প্রায় ৩৫জন নোবেল বিজয়ীর ছবি তুলছি। অস্কার বিজয়ী দুজন অভিনয় শিল্পীর ছবি তুলছি। অভিনেত্রী শ্যারন স্টোন, অভিনেতা হিউ জ্যাকম্যান, ১৪ বার গ্রামি অ্যাওয়ার্ড বিজয়ী কণ্ঠশিল্পী অ্যালিসিয়া কিস, রাজনীতিবিদ মিখাইল গর্বাচেভ, নোবেলজয়ী রাজনীতিবিদ লেস ওয়ালেসা, বিজ্ঞানী ডি. কার্ক, নোবেলজয়ী কবি ডেরেক ওয়ালকট ও অক্টোভিও পাজ, আরেক নোবলেজয়ী সাহিত্যিক গুন্টার গ্রাসসহ আরো অনেকের ছবি আমি তুলছি। গুন্টার গ্রাস তো ঢাকা আসছিল। ২০০৫ সালে কলকাতায় আসছিল, তার শেষ ভারত সফর। তখন আমি কলকাতায় ১০ দিন ছিলাম। তিনি যতদিন ছিলেন আরকি। তার পোরট্রেট করছি, তার সাথে সব অনুষ্ঠানে গেছি।
প্রশ্ন : গুন্টার গ্রাসের ঢাকা সফর নিয়ে আপনার অভিজ্ঞতার কথা বলুন?
নাসির আলী মামুন : ১৯৮৬ সালে গোপনে খবর পাইলাম গুন্টার গ্রাস ঢাকা আসবে। সম্ভবত বাইরের মানুষ হিসেবে একমাত্র আমিই জানতাম তিনি আসছেন। গ্যাটে ইনস্টিটিউটের পরিচালক গ্রাসের গাইড হিসেবে কবি বেলাল চৌধুরীকে ঠিক করলেন। বেলাল ভাই প্রস্তাব করলেন, গুন্টার গ্রাসের ঢাকা সফর স্মরণীয় করে রাখা হোক। কিভাবে? বললেন, একমাত্র একজন লোকই আছেÑ নাসির আলী মামুন, যে ক্যামেরাবন্দি করে রাখতে পারে এই সফরটি। বেলাল ভাই খবর দিলেন আমাকে, “আমার সাথে থাকবা তুমি, গ্রাস আসতাছে।” আমরা কাউরে জানাইলাম না। গুন্টার গ্রাসও জানাইতে চাইতেন না। প্রেস তিনি একদম পছন্দ করতে না। গুন্টার গ্রাস ৭দিন ছিলেন। দুএক জায়গা ছাড়া তার সাথে প্রায় সব জায়গায় গেছি। তারপর গুন্টার গ্রাসের ওপর আমার বই বাইর হইলো। আগামী প্রকাশনী বাইর করছে, ‘গুন্টার গ্রাসের ঢাকা আবিষ্কার’। ওই বই আমি গ্রাসকে পাঠাইছিলাম। পরে জানছি- সে বইটা পায় নাই। কিন্তু কলকাতায় যখন নিয়া গেছি তখন গ্রাস দেইখা অবাক হইয়া গেছে, “এইসব ছবি তুমি এখনো রাখছো!” আমি কইলাম, “হ্যাঁ, যতœ কইরাই রাখছি।” বললো, “একটা কপি আমারে দেও।” আমি একটা কপিই নিয়া গেছিলাম, ভাবছি বইটায় গ্রাসের অটোগ্রাফ নিবো। বইটাতে তিনি অটোগ্রাফ করলেন ঠিকই। তারপর বললেন, “আমাকে এক কপি পাঠাবা।” পরে ভাবলাম- বইটা দিয়াই দিই। শেষে সেখানকার জার্মান কালচারাল সেন্টারের পরিচালকের হাতে বইটা দিয়া দিলাম। কিন্তু পরিচালক আর গ্রাসকে বইটা দেয় নাই। পরে আমি আবার গুন্টার গ্রাসকে বইটা পাঠাইলাম। এইতো ২০১০-এ প্রকাশক রবীন হাসান ফ্যাঙ্কফুট বইমেলায় গেছিল। আমি বইটা রবীন হাসানকে দিলাম। সে গুন্টার গ্রাসের হাতে বইটি দিয়া আসছে। অনেক লোকের মাঝখানে গুন্টার গ্রাস এবং তার স্ত্রী নাকি বইটার পাতা উল্টাইয়া দেখছিল। ২০০৫ সালে গ্রাস যখন কলকাতায় গেল, তখন তার প্রত্যেকটা অনুষ্ঠানের ছবি তুলছি অত্যন্ত প্রতিবন্ধকতার মধ্যে। আমি বাংলাদেশ থেইকা গেছি সবাই জানে। গ্রাসের আশেপাশে সাঙ্গপাঙ্গ জমে গেছিল- কলকাতার কয়েকজন সাংবাদিক, একজন আর্টিস্ট, কলকাতার জার্মান কালচারাল সেন্টারের পরিচালক। তারা চায় নাই বাংলাদেশের কেউ ছবি তুলে বই করে ফেলুক। প্রত্যেকটা জায়গায় ওরা আমারে বাধা দিছে। ড. মার্টিন ক্যাম্পসেন নামে এক ভদ্রলোক আছেন। শান্তি নিকেতনে ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে আছেন। বাংলা জানেন। উনি রবীন্দ্রনাথের ওপর জার্মান ভাষায় বই করছেন। এই ভদ্রলোক একজন জার্মান হইয়াও আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হইলেন দেইখা আমি বিস্মিত। সে বাঙালি কায়দায় ভলেন্টিয়ার দিয়া আমারে অনুষ্ঠান থেইকা বাইর কইরা দিতো। কলকাতার সাংবাদিকরা ছবি তুলতাছে, আমি বললাম, “আমারে ছবি তুলতে দিবা না ক্যান? আমার তো আজকের অনুষ্ঠানের কার্ড আছে।” তখন জিজ্ঞাসা করে, “তুমি কি প্রেসের?” আমি কোনো সময় বলছি ‘প্রেসের’, কোনো সময় ‘প্রেসের না’ বলছি। কিন্তু যখন বলি, ‘প্রেসের’ তখন বলে, “আজকে প্রেস অ্যালাউড না।” যখন বলছি, ‘প্রেসের না’ তখন বলতো, “আজকে শুধু প্রেসের জন্য।” আমি দেখি, কলকাতার ফটোসাংবাদিকরা কার্ড ছাড়াই ছবি তুলতাছে। আমি দেখছি, ওই ক্যাম্পসেন চোখের ইশারায় আমার বিরুদ্ধে কাজগুলো করতো। আমি এগুলো দেইখাই বড় হইছি। বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশিষ্ট মানুষ, বুদ্ধিজীবীদের ষড়যন্ত্র এবং তাদের চোখ দিয়া কথা বলার ভাষা আমি বুঝি। এদের সাথে তো আমি ৪০ বছর ধইরা মিশতাছি। কলকাতা যাওয়ার আগে ড. ক্যাম্পসেনরে আমি ইমেইল করছিলাম, গুন্টার গ্রাস যে আসতাছে সে জানে কিনা। সে উত্তর দিলো, না আমি কিছুই জানি না। আমি গ্রাসের ইমেইল ঠিকানা, বাড়ির ঠিকানা এবং ফোন নম্বর চাইলাম। বললো, গ্রাসের সাথে তার নাকি কোনো যোগাযোগই নাই। তার কয়েকদিন পর ইন্টারনেটে সার্চ কইরা দেখি- সে গ্রাসের বাড়িতে গেছে, সাক্ষাৎকার নিছে, সেই সাক্ষৎকার ছাপাও হইছে। তার এই পুরা ষড়যন্ত্রের সাক্ষী হইলো কবি অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত। তিনি দীর্ঘকাল জার্মানিতে ছিলেন, গ্রাসের বন্ধু। তখন তাকে বারবার গিয়ে বলছি, দাদা দেখেন আমার সাথে কি আচরণ করতাছে। তিনি আমার প্রতি যথেষ্ট সহানুভূতি দেখাইছেন। জার্মান কালচালার সেন্টারের পরিচালককে পর্যন্ত তিনি ফোন করছেন, বলছেন, “গুন্টার গ্রাসের ওপর ওর বই আছে। ও আমাদের মেহমান, বাংলাদেশের নামকরা ফটোগ্রাফার। তোমরা কেন ওর সাথে এমন করতাছো?” পরিচালক কোনো সদুত্তর দিতে পারে নাই। এমনকি গ্রাসের সামনে আমারে কয়েকবার বাইর কইরা দিছে। গ্রাস দেখছে, কিচ্ছু বলে নাই।
প্রশ্ন : আপনি মাদার তেরেসারও অসাধারণ কিছু পোরট্রেট তুলেছেন? সেই অভিজ্ঞাতার কথা বলুন?
নাসির আলী মামুন : ১৯৮১ সালের জানুয়ারি মাসে মাদার তেরেসা ঢাকায় আসলো। তেজগাঁওয়ের একটা চার্চে উঠলেন। আমি খবর পাইলাম ওই চার্চ থেইকা অতোটা বাজে তিনি পুরান ঢাকায় যাবেন। সকালে চইলা গেলাম তেজগাঁও চার্চে। মাদার তেরেসা চার্চের ভিতরে, আমাকে ভিতরে ঢুকতে দিতাছে না। আমার সাথে ওয়ান টুয়েন্টি ইয়াশিকা ক্যামেরা। থার্টি ফাইভ মিলিমিটারের কোনো ক্যামেরা আমার তখন ছিল না। আমি অনেক অনুরোধ করলাম, তারপরও আমাকে চার্চের ভিতরে ঢুকতে দিলো না। কয়েকজন নান কিছুক্ষণ পরপর দরজা দিয়া উঁকি দিয়া চইলা যায়। দেখে বাইরে কেউ আছে কিনা। আমি একটু আড়ালে গেলাম। এর কিছুক্ষণপর দেখলাম মাদার তেরেসা ৩জন নানসহ দ্রুতপায়ে বাইর হইয়া আসলেন। তিনি যত দ্রুত হাঁটতাছিলেন তত দ্রুত আমিও হাঁটতে পারতাম না। নোবেলজয়ী তেরেসা একটা মাইক্রো বাসের কাছে চইলা গেলেন। আমি কাছে গিয়া মাদার তেরেসাকে অনুরোধ করলাম একটু সময় দিতে। তিনি মানতাছিলেন না। আমি মাইক্রো বাসের দরজা রোধ কইরা দাঁড়াইলাম। বললাম, “যেভাবেই হোক আমাকে একটু সময় দিতেই হবে।” মাদার তেরেসার ছবি তুলতে আমাকে কিন্তু কেউ বলেনি। মাদার তেরেসার ছবি তুলতে হবে এই চিন্তা থেকেই আমি গেছিলাম। যাইহোক, আমার সঙ্গে ছিলেন দৈনিক ইত্তেফাক-এর সিনিয়র করসপন্ডেন্ট নাজিমুদ্দিন মোস্তান সাহেব। তিনি মাদার তেরেসার সঙ্গে তর্ক শুরু কইরা দিলেন। আমি করতেছি অনুরোধ। মোস্তান সাহেব বললেন, “আপনাদের মিশনারি ও চ্যারিটির কাজ বিভিন্ন দেশে বন্ধ করে দেয়া হইছে, পশ্চিমবঙ্গেও আপনাদের কাজকর্ম নিয়া বিতর্ক আছে...আমার কাছে সেসব রিপোর্ট আছে।” এসব কথা শুনে মাদার তেরেসা উত্তেজিত হইয়া গেলেন। পরে বললেন, “চলে,া ভিতরে চলো।” মাদার তেরেসার সাথে আমি আর মোস্তান সাহেব চার্চের ভিতরে ঢুকলাম। একটা স্কুলঘরের মতো রুম। ওইদিন স্কুল ছুটি ছিল। ঘরের বেঞ্চে আমরা বসলাম। ঘর প্রায় অন্ধকার। তবে বড় বড় জানালা আছে। মোস্তান সাহেব মাদার তেরেসার সাক্ষাৎকার নিতে চাইলো, তেরেসা বললেন. “৫ মিনিটে শেষ করো।” আরো বললেন, “তোমরা সঠিক আচরণ করো নাই, আমাকে বাধা দেয়া ঠিক হয় নাই। জানো, কত শিশু আমার সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে?” মাদার তেরেসা তখন যাইতাছিলেন পুরান ঢাকার একটা এতিমখানায়। আমরা দুজনেই তার কাছে ক্ষমা চাইলাম। যাইহোক মোস্তান সাহেব সাক্ষাৎকার নিলেন, পরেরদিন সে সাক্ষাৎকার ইত্তেফাক-এ ছাপাও হইছিল। আলো কম, বেঞ্চের ওপর ক্যামেরা রাইখা খুব স্লো শাটারস্পিডে আমি ছবি তুললাম। বেশিরভাগ ছবিই ব্লার আসছে। প্রায় দেড় রোল শেষ করলাম। মনে বললাম, ক্ষমা চাইছি ঠিকই, কিন্তু যে প্রত্যাশা ও উদ্দেশ্য নিয়া আসছিলাম সে চাওয়া সফল হইছে। মাদার তেরেসা ঢাকায় ছিলেন মাত্র ৩দিন। তিনি যেখানে যেখানে গেছেন সেখানেই হাজির হইছি। কাকরাইলের চার্চ মাদার তেরেসাকে সম্বর্ধনা দেয়, তখনও ছবি তুলছি। পরেরদিন ছবি প্রিন্ট কইরা সে ছবিতে মাদার তেরেসার অটোগ্রাফও নিছি। কিন্তু তাকে ছবি দেয়া হয় নাই।
প্রশ্ন : একজন পোরট্রেট মডেলের মুখ আপনি কি খোঁজেন?
নাসির আলী মামুন : তার মুখে আমি অনেক অক্ষর দেখি। সেই অক্ষর দিয়া আমি যুৎসই বাক্য রচনা করি। আলো-ছায়ার খেলা করি। আমি আমার মডেলকে আবিষ্কার করার চেষ্টা করি। এমন হতে হবে, তোমার ছবি তুললে যাতে আমার মতো না দেখায়, আবার আমার ছবি তুমি তুললে যাতে মনে না হয় আরেকজনের ছবি। প্রত্যেক ব্যক্তির চেহারা, ঠিকানা, চিহ্ন তো আলাদা থাকে। একজন ব্যক্তির মধ্যে আরেকটি জিনিস থাকে তা হলো ব্যক্তিত্ব। সে বিখ্যাত লোক না হলেও তার নিজস্ব ব্যক্তিত্ব থাকে। সেই ব্যক্তিত্ব ছবির মধ্যে আসছে কিনা সেদিকে লক্ষ্য রাখি। আরো প্রক্রিয়া আছে, তার সাথে ব্যক্তিগত সম্পর্ক স্থাপন, তার সাথে গল্প করা, তাকে স্টাডি করা- এই আরকি।
প্রশ্ন : আপনার অভিজ্ঞতার ঝুলি পরিপূর্ণ। কোনো একটি স্মরণীয় ঘটনার কথা কি মনে পড়ে?
নাসির আলী মামুন : জীবনে অনেক স্মরণীয় ঘটনা ঘটছে। আমি যাদের ছবি তুলছি তারা তো সবাই জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতিমান লোক। এদের জীবনে গল্প থাকে। এদের প্রতি মানুষের কৌতূহল থাকে- এরা কি খায়? কিভাবে জীবনযাপন করে? আমারও কৌতূহল ছিল। যেমন- অ্যালেন গিন্সবার্গের বাসার ভিতরটা কি রকম আমি দেখছি। তার বাড়িতে আমি গেছি। এস এম সুলতানের ডেরাটা কেমন ছিল আমি জানি। তার সাথে থাকছি। সাধারণ মানুষ জানে না, তারা বিখ্যাত ব্যক্তির ইমেটিশন দিকটা দেখে। কিন্তু আমি ঘরের ভিতরে বিখ্যাতদের ‘র’ অবস্থায় দেখছি। নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সাথে বহুদেশ ঘুরছি। ২০০৮ সালে ইতালিতে যাইয়া একটা ঘটনা দেখলাম। একটা ফাইভ স্টার হোটেলে আমরা পাশাপাশি রুমে ছিলাম। তার সঙ্গে আমি ছাড়া কেউ নাই। এমন অবস্থায় আমি তখন শুধু তার ব্যক্তিগত ফটোগ্রাফারই না, ব্যক্তিগত সহকারীও হইয়া যাই। অঘোষিতভাবে আমি তার পার্সোনাল সেক্রেটারিও হইয়া যাই। মানে ১৯৭৮ সাল থেইকা ওই ধরনের একটা সম্পর্ক তার সাথে আমার তৈরি হইছে। তার অনেক কাজ কর্ম আমি করি। তাকে অ্যাসিস্ট করার চেষ্টা করি। সে চায় না, কিন্তু আমি করি। তিনি আমাকে পছন্দও করে, বিশ্বাসও করে। যাইহোক, তার রুমে হঠাৎ ঢুইকা গেছি। দেখি উনি কাপড় ইস্তিরি করতাছেন। এই দৃশ্য কোনোদিন দেখি নাই। ইতালির বিরাট এক অনুষ্ঠানের তিনি তখন প্রধান বক্তা। সেই লোক নিজে কাপড় ইস্তিরি করতাছে! আমি কিন্তু পাশের রুমেই। আমাকে অথবা হোটেলের কাউকে বলতে পারতো। আমি গিয়া বললাম, স্যার আমাকে দেন আমি করি। বললো, “না-না মামুন, তুমি ওই সোফায় বইসা আরাম করো।” এরকম বড় মাপের মানুষ উনি। নোবেল বিজয়ী একজন মানুষ, যিনি পৃথিবীর বড় বড় পুরস্কার অর্জন করছেন, এই উপমহাদেশে তার পর্যায়ের আর একটা লোকও নাই এবং এতো আন্তর্জাতিক পুরস্কার আর কেউ পায় নাই- তার মতো লোক কাপড় ইস্তিরি করতাছে! অনেক সময় তিনি বিভিন্ন দেশে গিয়া আমাদের ব্যাগ টানতে চায়। তার নিজের ব্যাগ কোনো সময় কাউকে টানতে দেয় না। তার দুহাতে দুই ব্যাগ, কাঁধেও ব্যাগ থাকে। পারলে আমাদের ব্যাগও চায়। তার সাথে না মিশলে এসব কথা বিশ্বাস করা কঠিন। ইউনূস স্যারের সাথে বিভিন্ন দেশে যাওয়ার সুবাদে পৃথিবীর অনেক বড় বড় নক্ষত্র-মানুষকে আমি পাইছি। এটা আমার জন্য অভাবনীয় ছিল। ড. ইউনূস না থাকলে আমি কোনোদিনও তাদের কাছে যাইতে পারতাম না।
প্রশ্ন : বিখ্যাত মানুষের ছবি তোলার সময় আপনার কেমন অনুভূতি হয়?
নাসির আলী মামুন : কোনো বিখ্যাত মানুষের সাথে দেখা হওয়ার আগে থেইকাই আমার ডান হাতের এই বিশেষ আঙুল- যেটা দিয়া আমি ছবি তুলি সেটা ক্লান্ত প্রজাপতির মতো নড়তে থাকে- কখন তার ছবি তুলতে শাটার-রিলিজ বোতামে চাপ দিবো।
প্রশ্ন : আপনি তো ফিল্ম ফটোগ্রাফি করেছেন। এখন ডিজিটাল ফটোগ্রাফির যুগ। আপনার পছন্দ কোনটি?
নাসির আলী মামুন : ফিল্ম ফটোগ্রাফি আর ডিজিটাল ফটোগ্রাফি- দুইটার স্বাদ দুইরকম। যেমন- সাদা ভাতও খাইতে ভালো লাগে, আবার খিচুড়ি খাইতেও ভালো লাগে। অনেকে খিচুড়ি পছন্দ করে, অনেকের পছন্দ সাদা ভাত। দুইটাই কিন্তু ভালো ভাবার, তাই কোনোটিকেই উপক্ষো করা যায় না। কোনোটিকেই ছোট করা যাবে না। আমার কাছে দুইটাই সমান। আমি দুইটাই পছন্দ করি। ডিজিটাল ছবির সারফেস লেয়ারটা হইলো খাঁড়া ডট। ডটের পর ডট দিয়া ইমেজ তৈরি হয়। আর আমার কাছে মনে হয় ফিল্মের সারফেসটা ওয়াটারকালার লেয়ারের মতো। তবে এই ডিজিটাল যুগেও আমি ফিল্মের এই ওয়াটারকালারটা মিস করি। পৃথিবীর যুগান্তকারী আবিষ্কারগুলোর মধ্যে ডিজিটাল ফটোগ্রাফি একটা। তারপরও ডার্করুমে ফিল্ম ডেভলপ করার আনন্দটা আর পাইনা বলে খুব দুঃখ হয়। ১৯৭৩ সাল থেইকা আমি নিজেই ফিল্ম ডেভলপ করতাম, ছবি প্রিন্টও করতাম। আমার এনলার্জার ছিল ’৭৪ সাল থেইকা।
প্রশ্ন : কোন ধরনের ক্যামেরা আপনার পছন্দ? মানে কোনো নির্দিষ্ট ব্র্যান্ড আছে কি?
নাসির আলী মামুন : একজন লেখককে যদি প্রশ্ন করা হয় আপনার কোন ধরণের কলম দিয়ে লিখতে ভালো লাগে, সে কি উত্তর দেবে? যে কলমে ভালো লেখা হয় সেই কলমই তার পছন্দ হবে। আলোকচিত্রীর ক্ষেত্রেও তাই। ছবি ওঠে এমন যেকোনো ক্যামেরাই আমার প্রিয়। যে লেন্স পরিস্কার, ফাঙাস নাই সেই লেন্সই আমার পছন্দ। এমনিতে নরমাল, মানে প্রাইম লেন্সই বেশি প্রিয়। ৫৫ মিলিমিটার প্রাইম হলে বেশি ভালো। কোনো নির্দিষ্ট ক্যামেরা ব্র্যান্ড নাই। এপর্যন্ত প্রায় ৪০টির উপরে ক্যামেরা ব্যবহার করছি। ওই যে বললাম- লুবিটেল, ইয়াশিকা, ফক্টল্যান্ডার, ক্যানন, নিকন...সব ধরনের ক্যামেরা ব্যবহার করছি। কালকে ‘ব্রোনিকা’ নামের একটা ক্যামেরা ব্যবহার করলাম। দৃক থেইকা ধার নিছিলাম। ওয়ান টুয়েন্টি ফিল্ম, ৮টা এক্সপোজার দেয়। দারুন ক্যামেরা। এইধরনের ক্যামেরা আগে কোনোদিনও ব্যবহার করি নাই। ক্যামেরাটা ধার নিতে হইলো কারণ সাদা-কালো ছবি তোলার জন্য দরকার ছিল। ফটোগ্রাফির প্রথম ৬ বছরে আমি ২টা ক্যমেরা কিনছিলাম। ’৭৩ সালে ‘প্যাট্রি’ নামের একটা জাপানি ক্যামেরা কিনি। নিউমার্কেট থেইকা সাড়ে ৬শ টাকা দিয়া এই থার্টি ফাইভ মিলিটার টুইন লেন্স ক্যামেরাটা কিনছিলাম। সাড়ে ৬শ টাকা তখন অনেক টাকা। ধার-টার কইরা কিনছি। এই ক্যামেরাটা কয়েক মাস চালানোর পর আরেকটা ক্যামেরা পাইলাম। জাপানি ক্যামেরা ‘কাওয়া’। ওইটা ছিল এসএলআর নরমাল লেন্স। ভাবলাম পোরট্রেটের জন্য এসএলআর ভালো হইবো। ৮শ টাকা দিয়া কিনছিলাম। ১৯৭৪ সালের কথা। কয়েক মাস ব্যবহারের পর কাওয়া নষ্ট হইয়া গেল। ঠিক করাই, আবার নষ্ট হয়। এভাবে ক্যামেরাটা ৩২ বার নষ্ট হয়। ৩৩ বার যখন নষ্ট হইলো তখন দোকান থেইকা আর আনি নাই। ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত মাত্র বছর দেড়েক আমার নিজের ক্যামেরা ছিল। ওই ‘প্যাট্রি’ আর ‘কাওয়া’। তার মানে ফটোগ্রাফির প্রায় সাড়ে ৫ বছরে আমার এই দুইটা ক্যামেরা ছাড়া আর কোনো ক্যামেরা ছিল না। ’৭৭ সালের শেষে একটা সেকেন্ডহ্যান্ড ওয়ান টুয়েন্টি ক্যামেরা কিনলাম, ১৮শ টাকা দিয়া। তার আগে ধার করে করে চালাইছি। একটা স্টুডিও মালিকের সাথে ভালো সম্পর্ক ছিল, তার কাছ থেইকা ক্যামেরা ধার করতাম। স্টুডিওতে একটাই ক্যামেরা ছিল। স্টুডিওর কাজ শেষ হইলে আমারে ক্যামেরাটা দিয়া দিতো- এতো ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। আমি ভোরে কাজ করতাম। স্টুডিও খুলতো সকাল ৯টায়, তার অগেই ক্যামেরা ফেরত দিতে আমি স্টুডিওর সামেন দাঁড়ায়ে থাকতাম। দূর থেইকা সেই লোক দেখতো বন্ধ স্টুডিওর সামনে একটা লোক দাঁড়ায়া আছে- সে আমি। সকালে আমি ছবি তুইলা আসতাম। আমি যেহেতু ফ্যাশ ফটোগ্রাফি করি না। নরমাল আলো-ছায়ায় ঘরের মধ্যে ছবি তুলতাম। তাই সকালে এক ঘণ্টা, দেড় ঘণ্টা কাজ করা আমার জন্য কঠিন ছিল না। সকালে কাজ শেষে ক্যামেরা ফেরত দিতাম। এইভাবে সংগ্রাম কইরা কইরা আমি ফটোগ্রাফি করছি। এখনো আমার কোনো ভালো ক্যামেরা নাই। দৈনিক পত্রিকায় আমি ভালো ভালো ক্যামেরা ব্যবহার করছি। পত্রিকা ছাড়ার পর ক্যামারা ফেরত দিছি, ফলে এখনো আমার কোনো দামি ক্যামেরা নাই। বেশি দাম দিয়া ক্যামেরা কেনার টাকা নাই।
প্রশ্ন : বাংলাদেশে ফটোগ্রাফি করতে গিয়ে কি ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয় বলে আপনি মনে করেন?
নাসির আলী মামুন : বাংলাদেশের ফটোগ্রাফাররা অনেক চ্যালেঞ্জের মুখে থাকে। বাংলাদেশের ফটোগ্রাফাররা মানুষ, এরা কেউ ওয়াসার পানি বা হাওয়া খেয়ে বাঁচে না। এদের ভাত খাইতে হয়। জামা-কাপড়ও পরতে হয়। আর এই চাহিদাগুলো পূরণ করতে টাকার দরকার। বাংলাদেশে যারা চাকরি না কইরা সিরিয়াসলি শিল্প হিসেবে অথবা বাণিজ্যিকভাবে ফটোগ্রাফি করে তারা কেউ ভালোভাবে বেঁচে থাকতে পারতাছে? আমার তো মনে হয় না পারতাছে। অনেকেই পত্রিকায় চাকরি কইরা মোটামুটি ভালোই আছে। যারা চাকরি করে না তাদের কয়েকজন ছাড়া কারোরই ভালো আয় নাই। যেমন- আমি। আমাদের ছবি লোকজন কিনতে চায় না। কারণ বাংলাদেশে ফটোগ্রাফির বাজার নাই। দেশটা গরীব-দুর্বল। যারা ধনী তাদেরও রুচি নাই। দুএকজন ছাড়া ফটোগ্রাফি যে শিল্প বড়লোকরা সম্ভবত তাই জানে না। অনেক কষ্টে আমরা আগাইতাছি। বাংলাদেশের যে আর্থিক বিকাশটা হওয়ার কথা ছিল তা হয় নাই।
প্রশ্ন : কাদের তোলা ছবি ভালো লাগে?
নাসির আলী মামুন : বিশ্বের বড় বড় পোরট্রেট ফটোগ্রাফারদের তোলা ছবি ভালো লাগে, যেমন- ইউসুফ কার্শ, রবার্ট ম্যাপলথর্প, রিচার্ড আভেডন প্রমুখ। এন অটোবায়োগ্রাফি নামে আভেডনের একটা বই আছে। ১৯৯৩ সালে নিউইয়র্কে বইটা সে আমারে উপহার দিছিল। বিরাট বই। আত্মজীবনী নাম হলেও বইটাতে আছে অনেকগুলো ছবি। বইটাতে দুপৃষ্ঠা লেখা আছে, সেখানে তিনি লেখছেন- একজন ফটোগ্রাফারের লেখার কিছু নাই, এই ছবিই আমার আত্মজীবনী। আমাকে দেয়া বইটার এক পাতায় একটা ছবিও আঁইকা দিছে। আর হাল আমলে পৃথিবীর এখন অন্যতম শ্রেষ্ঠ পোরট্রেট ফটোগ্রাফার হলো অ্যানি লাইবোভিৎজ। উনি নিউইয়র্কে থাকেন। তার ছবির আমি ভক্ত। তার তোলা অনেক পোরট্রেট দেখি আমি। আউটডোর-ইনডোরে যেসব ছবি তোলেন তা দেইখা আমি অবাক হইয়া যাই, কিভাবে ভদ্র মহিলা এতো ক্লাসিক এবং যন্ত্রণার মুহূর্তগুলা পোরট্রেটে জীবন্ত কইরা তোলেন! তার তোলা হোয়াট হাউসের ছবি দেইখা অবাক হইছি। আবার হাসপাতালে তার ক্যান্সার আক্রান্ত বন্ধু সুসান মারা যাইতাছে সেই ছবিও তুলছে। আর তার সেল্ফ পোরট্রেট তো আরো অসাধারণ। তার সাথে এই মে মাসে (২০১২) শিকাগোতে দেখা হইছিল। নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ীদের নিয়া একটা সম্মেলন হইতাছিল, সেখানে তিনি একটা স্টুডিওর মতো করছিল। ওই স্টুডিওতে তিনি শান্তিতে নোবেলজয়ী ব্যক্তিদের ছবি তুলছে। ইউনূস স্যারেরও অনেকগুলা পোরট্রেট করছেন। আমেরিকার বিখ্যাত ভেনিটি ফেয়ার ম্যাগাজিনের পক্ষ থেকে অ্যানি লাইবোভিৎজ ছবি তুলতে আসছিলেন। তার সাথে ছবি তুললাম। তারপর সে আমারে তার সেল্ফ পোরট্রেট আঁইকা দিছিলেন। প্রিয় দুজন ফটোগ্রাফারের সাথে আমার দেখা হইছে, একজন আভেডন, মারা গেছেন। আর এই অ্যানি লাইবোভিৎজ। বাংলাদেশের অনেকের ছবি আমার ভালো লাগে। নাম বলতে গেলে সমস্যা। ওই যে বললাম, হাঁ কইরা আছে যারা তারা কামড় দিয়া খাইয়া ফেলবে। বলবে, “শালা আমার নাম বলে নাই।”
প্রশ্ন : আপনি তো সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল কিন্টন, বর্তমান প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা উভয়েরই ছবি তুলেছেন?
নাসির আলী মামুন : ইউনূস স্যারের কল্যাণে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল কিন্টনের সাথে আমার কয়েকবার দেখা হইছে। কিন্তু খুব কাছে থেইকা তার পোরট্রেট তোলা হয় নাই। স্যারের কারণে বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা, পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি কিন্টন এবং আরো অনেকের সাথে দেখা হইছে, ছবিও তুলছি। আমি যেখানে বসা ছিলাম তার ঠিক সামনেই ফার্স্ট লেডি মিশেল ওবামা বসেছিলেন। তার কানের পাশে আমার ক্যামেরা টাসটাস শব্দ করছে। ভাবতাছিলাম- সিকিউরিটি আইসা আমারে সরাইয়া না দেয়। কেউ সরাইয়া দেয় নাই। তাতে বুঝছি ফার্স্ট লেডি মিশেল ওবামা অত্যন্ত ধৈর্য্যশীল ও ভালো মানুষ। আমি যেভাবে ৪০ মিনিট একটার পর একটা শাটার টিপছি, ২শ মিলিমিটারের লম্বা লেন্স তার কানের কাছে- কিন্তু তিনি কিচ্ছু বলেন নাই।
প্রশ্ন : এই মুহূর্তে আপনাকে যদি বিশ্বের কোনো বিখ্যাত বা কুখ্যাত ব্যক্তির পোরট্রেট করার সুযোগ দেয়া হয় তাহলে কার ছবি তুলবেন?
নাসির আলী মামুন : নেলসন মান্ডেলার ছবি তুলতে চাইবো। তার ছবি তোলা হয় নাই। মান্ডেলাকে সামনাসামনি দেখিও নাই। বাংলাদেশে যখন আসছিলেন তখন তার কাছে যাওয়ার সুযোগ হয় নাই। তার ছবি তুলতে আগ্রহী আমি।
প্রশ্ন : এমন কয়েকজনের নাম কি বলবেন যাদের সংস্পর্শে এসে বেশি আনন্দিত হয়েছেন?
নাসির আলী মামুন : অবশ্যই। প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস। যারে বলা হয় পৃথিবীর গ্রেটেস্ট সিভিলিয়ন। শুধু নোবেলসহ এতো পুরস্কার পাওয়ার জন্যই না, তার কাজ, ক্যারিশমা, লাইফ অ্যান্ড টাইমসের কারণে তিনি এতো বড়। এই রকম একটা ফিগার পৃথিবীতে আজ পর্যন্ত হয় নাই। এরকম একজন মানুষের ঘনিষ্ঠ হওয়া, তার সাম্রাজ্যে আমার মতো একজন নগণ্য লোকের বাসিন্দা হতে পারাটাকে আমি বিরাট সৌভাগ্য মনে করি। এজন্য আমি নিজের গলায় নিজে প্রত্যেকদিন মালা পরাই। যাদের সংস্পর্শে আসতে পাইরা নিজেকে ভাগ্যবার মনে করি তাদের মধ্যে আরো আছেন শিল্পী এস এম সুলতান ও কবি শামসুর রাহমান।
প্রশ্ন : বিশ্বফটোগ্রাফির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অবস্থান কোথায়?
নাসির আলী মামুন : বিশ্বফটোগ্রাফির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে সম্প্রতি আগাইয়া যাইতাছে। পশ্চিমা দেশগুলোর ফটোগ্রাফারদের সাথে আমাদের দেশের তরুণ ফটোগ্রাফাররাও আছে। ফটোগ্রাফির বিশ্বমিছিলে বাংলাদেশও আছে। এই মিছিলে আমেরিকা, জার্মানি, ফ্রান্স, ইংল্যান্ডের মতো দেশ আছে। ওরা হয়তো সামনের কাতারে আছে, আমরা একটু পিছে আছি। যেহেতু ফটোগ্রাফি আবিষ্কারই হইছে পশ্চিমা দেশে, ফলে আবিষ্কারের সাথে সাথে সে অঞ্চলের মানুষ এর সুবিধা নেয়া শুরু করছে। এই ফটোগ্রাফি আমাদের দেশে আসছে কবে? মাত্র ৬০-৭০ বছর আগে। তুমি আমারে পূর্ববঙ্গের একজন বাঙালি ফটোগ্রাফারের নাম বলো যে ১শ বছর আগে ফটোগ্রাফার ছিল? পাইবা না। ওই অনুযায়ী আমরা অনেক আগাইছি। তারওপর গরীব দেশ, শিক্ষা-দীক্ষা আমাদের কম, সেই তুলনায় আমি মনে করে আমাদের দেশের এখনকার ফটোগ্রাফিতে নতুন জোয়ার আসছে। বাংলাদেশে ফটোগ্রাফির আন্দোলন শুরু হইছে দৃক, পাঠশালা এদের মাধ্যমে। পাঠশালায় একটি মেধাবী প্রজন্ম সৃষ্টি হইছে এবং তারা ফটোগ্রাফিক আন্দোলনটাকে অনেক দূর নিয়া গেছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে গিয়া কাজ করতাছে, বড় বড় অনেক আন্তর্জাতিক পুরস্কার নিয়া আসতাছে। আমরা এগুলো জানতামও, করতামও না। আমি দেশী-বিদেশী কোনো প্রতিযোগিতায় অংশ নেই নাই।
প্রশ্ন : আপনার জীবনে আরেকটি অভিনব ঘটনা ঘটেছিল। আপনি রক্ষীবাহিনীর হাতে ধরা পরেছিলেন, কবি আল মাহমুদের সাথে জেলও খেটেছেন...
নাসির আলী মামুন : ১৯৭৪ সালের ১৭ মার্চ ধরলো আওয়ামী লীগ সরকারের রক্ষীবাহিনী। ওইদিন ছিল জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন। তার আগে বঙ্গুবন্ধুর কয়েকবার পোরট্রেট করছি। কিন্তু তিনি আমারে ব্যক্তিগতভাবে চিনতো না। আমি তাকে অনেক শ্রদ্ধা করি, আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে না। যাইহোক- সেই বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে রক্ষীবাহিনী অনেকরে পিটাইলো, গুলি কইরা মারলো। সরকারি হিসাবেই ৯জন মারা গেছে। কিন্তু আমরা যতদূর জানি, ২০জনেরও বেশি মানুষ হত্যা করা হইছিল। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মনসুর আলীর মিন্টো রোডের বাড়ির সামনে এই হত্যাকা- ঘটনানো হয়। ঘটনার পর সরকার এক প্রেস নোটের মাধ্যমে জানায়, যারা নিহত হয়েছে তারা আইসা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাড়িতে আগুন জ্বালাইয়া দিছিল। আসলে তা না। ওইদিন পল্টন ময়দানে জাসদের মেজর জলিল, আসম আব্দুর রব এবং অন্যান্য নেতা-নেত্রীরা বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে বিরাট সভার আয়োজন করছিল। সভা থেইকা মিছিল নিয়া তারা একটি স্মারকলিপি দিতে মিন্টো রোডে আসে। কোনো আগুন-টাগুন, ইট-পাটকেলের ব্যাপার ছিল না। স্মারকলিপি দিছিলো কিনা আমি জানি না। সম্ভবত দিছিলো। এই মিছিলে অতর্কিত হামলা চালায় রক্ষীবাহিনী। পুলিশ কিছু করে নাই। পুলিশ বরং জাসদের নেতা-কর্মীদের মাইর থেইকা বাঁচাইয়া দিছে। রক্ষীবাহিনী মিছিল ঘেরাও কইরা গুলি করছে। কিছু লোক রমনা পার্কের দিকে ভাইগা গেছে, আমরা অনেকে মাটিতে শুইয়া পড়লাম। ওই শোয়া অবস্থাতেও ওরা গুলি চালায়। রব-জলিল সেখান থেইকাই অ্যারেস্ট হইছে। আমারে ওখান থেইকা ধরছে, আমার হাতে একটা ওয়ান টুয়েন্টি ইয়াশিকা ক্যামেরা ছিল। মিছিলের সাথে আমি ছিলাম। পল্টনেই আমি রব ও জলিলের ছবি তুলছি। আমার ক্যামেরাটা একজন নিয়া নিল, ফিল্মটা ফালাইয়া দিলো। রক্ষীরা অনেক পিটাইলো। রক্ষীরা ক্যামেরাটা পুলিশকে দিলো। পুলিশ আমারে নিয়া গেলÑ শাহবাগের পাশে পুলিশ কন্ট্রোল রুম ছিল সেখানে। সেখান থেইকা রক্ষীবাহিনীর গাড়িতে কইরা আমারে নেয়া হইলো রমনা থানায়। থানার ওসি ক্যামেরাটা রাইখা দিল। আমি ভাবছি ক্যামেরা আর পাওয়া যাইবো না। আমারে ভাবছে সাংবাদিক, তাই পুলিশের হেফাজতে রাখছে। আসলেই সাংবাদিক কিনা রক্ষীরা দেখতে চাইছে। রক্ষীরা আইডি কার্ড চাইছে, কইছি, পইড়া গেছে। জিজ্ঞাসা করছে, কোন পত্রিকা? তখন মুক্তিযোদ্ধা সংসদের একটা সাপ্তাহিক পত্রিকা ছিল- গ্রেনেড। বছরখানিক বের হওয়ার পর বন্ধ হইয়া যায়। বলছি, সেই পত্রিকার সাংবাদিক। যার জন্য রক্ষীবাহিনী হোঁচট খাইয়া আমারে পুলিশের হাতে দিয়া দিছে। পুলিশ ভালো ব্যবহার করছে, রাতে খাইতেও দিছে। আমি মাথা নিচু কইরা থানায় বইসা আছি, আমার সাথে সব চোর, বদমায়েশ, পকেটমার। জাসদের কেউ নাই, তাদের সবাইরে কারাগারে পাঠানো হইছে। রাত আড়াইটার দিকে পরিচিত একটা কণ্ঠ শোনা যাইতাছে। চোরদের সাথে কথা বলতাছে। আড়চোখে তাকাইয়া দেখি যে কবি আল মাহমুদ। কবির ছবি তুলছি আমি ১৯৭৩ সালে। আমি তখন আবার মাথা নিচু কইরা রইলাম। আমি লজ্জা পাইতাছি, আমারে যদি চিনে ফেলে? আল মাহমুদ সবার সাথে কথা বলতে বলতে আমার কাছাকাছি চইলা আসলো। আমাকে বললেন, “এই যে ভদ্রলোক দেখি-দেখি”। আমি তখন মাথা উঠাইলাম, “আরে তুমি!” আল মাহমুদ অবাক হইলেন। আমাকে তার চেনাচেনা লাগতাছে। আমাকে তিনি তখনো সেইভাবে চেনেন না। দেখছে কয়েকবার। তিনি তখন জাসদের গণকণ্ঠ পত্রিকার সম্পাদক। পুলিশ তাকে তার বাসা থেইকা ধইরা নিয়া আসছে। আমারে জিজ্ঞাসা করলেন “কি হইছে?” আমি ঘটনা বললাম। একদম কাঁইদা ফেললাম। সে আমাকে সাহস দিল, “অসুবিধা নাই, আমাকেও ধইরা নিয়া আসছে। চিন্তা কইরো না, আমাদের কোনো অসুবিধা হইবো না।” তার হাতে একটা বলপেন, একটি ছোট কবিতার বই। বইটা কলকাতা থেকে বাইর হইছিল- ‘আল মাহমুদের কবিতা’। তার গায়ে একটি ফুল প্যান্ট ও হাফ টিশার্ট। তার সাথে অনেক কথা বললাম। রাত্রে ঘুম হইলো না। পরেরদিন ভোরবেলা পুলিশের ভ্যান আইসা আমাদের নিয়া গেল ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে। গাড়িতে করে আমরা যাচ্ছি, সারা শহর তখন স্তব্ধ। কারফিউর মতো অবস্থা। আমাদের নিয়া যাইতাছিল জিপিও’র সামনে দিয়া। দেখলাম দাউদাউ কইরা জ্বলতাছে জাসদের অফিস। গ-গোল দেইখা পুলিশের গাড়ি আর নবাবপুর দিয়া গেল না। গেল বঙ্গবাজারের ওদিক দিয়া। তখন অবশ্যও বঙ্গবাজার ছিল না, ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনও ছিল না। কেন্দ্রীয় কারাগারে নিয়া আমারে দুপুর ৩টা পর্যন্ত বসাইয়া রাখছে এবং আমার হাত পেছনে হ্যান্ডকাপ দিয়ে বাঁধা। আল মাহমুদ যেহেতু কবি-সম্পাদক তাই তার হাত বাঁধা না। আল মাহমুদ বারবার পুলিশের কাছে রিকয়েস্ট করতাছে, “আমরা তো কারাগারের ভেতরেই চইলা আসছি, এই ছেলেটার হাতটা ছাইড়া দেন।” এমএ আউয়াল নামে জাসদের একজন নেতা তখন কারাগারে, তার স্ত্রী আসছে তার সাথে দেখা করতে। এমএ আউয়ালের স্ত্রীও অনুরোধ করলেন, “ছেলেটার হাতটা ছাইড়া দেন, বাচ্চা মুনষ।” পুলিশ তবুও খুইলা দিল না- এত্তো হারামি! পুলিশ আদি যুগ থেইকাই হারামি। বাংলাদেশে পুলিশ যখন তার পোশাক পরছে তখন তার মধ্যে একটা অশুভশক্তি চইলা আসে। আর যখন অস্ত্র হাতে পাইছে তখন সেই অশুভশক্তি বিদ্যুতায়িত হইছে। অন্য দেশের পুলিশের কাহিনী আলাদা। যাইহোক। কবি আল মাহমুদের সাথে কারাগারে ছিলাম। আমাদের সিনিয়ার ভাই মুক্তিযোদ্ধা আবদুল আজিজ তখন বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাধারণ সম্পাদক। ছাত্রলীগের লোক ছিল। উনি তাদের গ্রেনেড পত্রিকা থেইকা আমার নামে আইডি কার্ড বাইর কইরা ঢাকার এসপিকে ধরলো। পুলিশ প্রশাসনের ইতাহাসে এই এএসপি মাহবুব সবচেয়ে হারামি ছিল। সে-ই সিরাজ সিকদাররে মারছে। জীবিত আছে এখনো। আবদুল আজিজ ভাই তার কাছে গেল। সে তখন যেকোনো লোকের কাছে যাইতে পারতো। এসপি মাহবুব বলে, “না। ওতো জাসদ করে, আমি ছাড়বো না।” সে ছাড়লো না। তারপর ভাই গেল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ক্যাপ্টেন মনসুল আলীর নির্দেশে ৯দিন পর আমি ছাড়া পাইছি। আল মাহমুদ ভাইরা ছিলেন এক বছর। এক বছর পর ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করলো, তখন আল মাহমুদ ও অন্যান্যরা বাইর হইয়া আসলো। বাইর হইয়া আল মাহমুদ ভাই চাকরি পায় না, খুবই খারাপ অবস্থা তার। এতোগুলা ছেলে-মেয়ে নিয়া সে কোথায় যাবে? তারে দুই কারণে কেউ চাকরি দেয় নাই, প্রথমত সে জাসদ করতো, দ্বিতীয়ত সে বড় কবি। তার মতো এতো বড় একজন কবিরে পরে বঙ্গবন্ধু সরকারই চাকরি দিছিল। শিল্পকলা একাডেমীতে একটা কেরানির মতো চাকরি সে পায়। পরিচালকও তারে করা হয় না। যুক্তি দেখাইছে- তার শিক্ষাগত সার্টিফিকেট নাই। যাইহোক, বাংলাদেশের একজন ফটোগ্রাফার হিসেবে আমার সৌভাগ্য কবি আল মাহমুদের সাথে জেল খাটছি। জেল থেইকা বাইর হইয়া, পরেরদিনই গেলাম রমনা থানায়। আমার আত্মাটা তো ওইহানেই রইয়া গেছে। আমি ভাবছিলাম, ওরা আমার ক্যামেরা তো দেবেই না বরং হেনস্তা করবো। তরুণ-স্মার্ট শিক্ষিত ওসি, আমারে খুব খাতির-টাতির করলো, চা খাওয়াইলো, বললেন, “দেখেন ওগুলার মধ্যে আর যাইয়েন না। জাসদ করেন?” আমি বললাম, “না।” বললেন, “না, আপনি করেন, না করলে কি আপনাকে ধইরা আনে?” কইলেন, “আপনার ক্যামেরা যেভাবে ছিল সেভাবেই আছে, আমি পরিস্কার কইরা রাখছি।” ক্যামেরাটা দিল, প্যাকেট করা, সত্যিই পরিস্কার।
প্রশ্ন : সেই ঐতিহ্যবাহী প্রশ্ন মামুন ভাই- ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কি?
নাসির আলী মামুন : ‘ফটোজিয়াম’ নামে ফটোগ্রাফি ভিত্তিক একটি জাদুঘর করতে চাই। এটা হবে আমার ব্যক্তিগত আর্কাইভের মতো। জাদুঘর দেখার জন্য দর্শক আসবে, পাঠক আসবে। এই জাদুঘরে আমার তোলা ছবি, বিভিন্ন বিখ্যাত ফটোগ্রাফারদের সেল্ফ পোরট্রেট, আমার তোলা নয় কিন্তু আমার সংগ্রহে থাকা ষাট ও সত্তর দশকে স্টুডিওতে তোলা কিছু পোরট্রেট, সে আমলের ক্যামেরা ইত্যাদি রাখতে চাই। আর প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে নিয়া একটা পুরা ফোর থাকবে। ফটোজিয়ামের কিছুই হয় নাই। এখানে (সাভার) করার জন্য আমি আয়োজন করছি। আমি বিভিন্ন জায়গায় কর্মশালা করতে গেলে এবং সাক্ষাৎকারে বলি। আমার কেনা জমি আছে, জিনিসপত্রও আছে, এখন একটা ভবন বানানো বাকি। প্রায় ৬ কোটি টাকা দরকার লিফ্ট, এসি ও ডেকোরেশনসহ ভবন করতে। দেশী-বিদেশী শিল্পমনা, ব্যবসায়ী, শিল্পপতিরা যদি আগায়ে আসে অথবা কোনো তরুণ আসলো ফান্ড রেইজ করার ভালো আইডিয়া নিয়া- আমি তাদের স্বাগত জানাই। তারা যদি আমাকে পরামর্শও দেয় যে কিভাবে জাদুঘরটা গড়ে উঠতে পারে তাও আমি গ্রহণ করবো। বাংলাদেশে ফটোগ্রাফি ভিত্তিক কোনো জাদুঘর নাই। বিখ্যাত লোকদের পাণ্ডুলিপি-চিঠি-ডায়েরি-ব্যবহৃত জিনিসপত্রের একটা বড় সংগ্রহ আমার আছে। অমার কাছে যতগুলা পাণ্ডুলিপি আছে সম্ভবত বাংলা একাডেমীর কাছেও ততো নাই। অনেক অপ্রকাশিত অডিও-ভিডিও সাক্ষাৎকার আছে আমার সংগ্রহে। আরো আছে এস এম সুলতানের দাঁত, শামসুর রাহমানের চুল, জুতা, শার্ট, চশমা। শামসুর রাহমান শার্টে লিখে দিছে- “আমাকে ভুলে গেলে ক্ষতি নেই, আমার কবিতাকে মনে রেখো।” শার্টটা যখন দেখি তখন কান্না আসে। এগুলাও যদি জাদুঘরে রাখতে পারি তাহলে মানুষ দেখতে পারবো। শুধু আমার তোলা ছবি থাকলে মানুষ দেখবো না। এজন্য এই জিনিসপত্রগুলা, অন্যান্য ফটোগ্রাফারদের সেল্ফ পোরট্রেট এবং ড. ইউনূস সংগ্রহশালা রাখবো। ইউনূস স্যারের হাতে আঁকা কিছু ছবি আমার কাছে আছে। যেগুলো পৃথিবীর আর কারো কাছে নাই। এগুলাও রাখবো।
প্রশ্ন : ফটোগ্রাফির উন্নয়নে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো কি করতে পারে?
নাসির আলী মামুন : ফটোগ্রাফির উন্নয়নে সরকার কোনোদিনও চিন্তা করে নাই, এখনো করে না। যদি করতো তেইলে ঢাকা বিশ্বাবিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগে অথবা আলাদা একটা বিভাগে ফটোগ্রাফি থাকতো। থাকা উচিত। বাংলাদেশে এই যে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হইতাছে ওদেরও একটা করে ফটোগ্রাফি বিভাগ থাকা উচিত। যদি আলাদা বিভাগ করতে নাও পারে, অন্তত সাংবাদিকতা বিভাগের সাথে যুক্ত করে দিতে পারে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর শিল্পকলা একাডেমীর জন্ম হইছে। এতো বছরে শিল্পকলা একাডেমীর ফটোগ্রাফি নিয়া একটা আলাদা বিভাগ থাকা উচিত ছিল না? যেখানে ওদের চারুকলা বিভাগ আছে, প্রকাশনা বিভাগ, সঙ্গীত বিভাগ আছে- এমনকি নৃত্যুকলা বিভাগ আছে। থাকা উচিতও। সেখানে ফটোগ্রাফির একটা বিভাগ থাকা উচিত ছিল। আমি নৃত্যশিল্পীদের বিপক্ষে যাইতাছি না। নৃত্যশিল্পকে স্যালুট দিই আমি। কিন্তু বাংলাদেশে কত হাজার লোক এই শিল্পের সাথে জড়িত? আর কত লাখ মানুষ ফটোগ্রাফিশিল্পের সাথে যুক্ত? এবং কত পুরস্কার পাইছে ফটোগ্রাফাররা? কয়টা পুরস্কার পাইছে নৃত্যশিল্পীরা? ফটোগ্রাফিশিল্পের গুরুত্ব বুঝাইতে এই উদাহরণ দিলাম। মন্ত্রণালয় বা সরকার ফটোগ্রাফিকে শিল্প হিসেবে নিতাছে না। আমাদেরকে একুশে পদক, স্বাধীনতা পদক- এসব রাষ্ট্রীয় পদকগুলা কেন দেয়া হয় না? এই হাল আমলে দিছে। এর আগে কোনোদিন দেয় নাই। সম্প্রতি রশীদ তালুকদার পাইলো, আমানুল হক সাহেব পাইলো। নাইব উদ্দিন আহমেদ পান নাই, ড. নওয়াজেশ আহমেদ পান নাই। এসব রিকগনেশন তো আমরা পাইতে চাই। এগুলো আমরা দাবি করি। এগুলা পাওয়ার অধিকার আমরা রাখি।
আর ফটোগ্রাফির উন্নয়নে গণমাধ্যম যা করতে পারে তা আর কেউ করতে পারে না। দৈনিকগুলাতে একজন ফটো এডিটর থাকা দরকার। আমাদের মিডিয়ার সবকিছু ভিজ্যুয়াল। একটা দৈনিক পত্রিকায় প্রতিদিন অনেক ছবি ছাপা হয়। ম্যাগাজিনগুলাতেও অনেক ছবি ছাপা হয়। সেই ছবিগুলা ঠিকমতো নির্বাচন করা, ছাপা এবং ক্যাপশন দেয়া এবং ভালো ছবি তোলার জন্য ফটোগ্রাফারদের দিক-নির্দেশনা দিতে একজন মুরুব্বির দরকার। সেই মুরব্বিই ফটো এডিটর। আমাদের পত্রিকাগুলাতে ফটো এডিটর আছে? নাই। আমি যেমন দৈনিক প্রথম আলোর ফটো এডিটর ছিলাম দীর্ঘদিন। ফটোগ্রাফারদের আমি পরামর্শও দিতাম। কিন্তু বেশিরভাগ সময় দেখতাম- আমি ফটো এডিট কইরা যে ফোল্ডারে রাখতাম সে ফোল্ডারটা নাই। কে বা কারা উধাও কইরা ফেলতো। পরেরদিন পত্রিকা খুইলা দেখতাম আমি যে ছবিগুলা নির্বাচন করছিলাম সেগুলো ছাপা হয় নাই। তাহলে কিসের জন্য আমার পদটা? এটা কি প্রহসন না? আমার কাজটি করতেন নিউজ এডিটর। তিনি তো ফটোগ্রাফি বিষয়ে বিশেষজ্ঞ না। ফটোগ্রাফি বিষয়ে উনি মূর্খ। কিন্তু ছবি নির্বাচন সেই করতো। আর আমার নির্বাচনকে উপেক্ষা করতো। এবিষয়ে বহুবার আমি দৈনিক প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান সাহেবের সাথে আলাপ করছি। কিন্তু কোনো কাজ হয় নাই। মতিউর রহমান সাহেবের সাথে আমার শ্রদ্ধার সম্পর্ক। তিনি আমাকে এখনো স্নেহ করেন। আমি যে কি উনি তা জানেন। আর সবগুলো পত্রিকার উচিত দেশে যারা বরেণ্য শিল্পী আছে, কাজের লোক, মেধাবী তাদেরকে বিকশিত হওয়ার সুযোগ দেয়া। কিন্তু বিকশিত হওয়ার সুযোগ কোন ফটোগ্রাফারদের দেয়? যারা অনেক জুনিয়ার। তারা ৬তলা পর্যন্তও উঠতে পারবে না। যারা তাদের সুযোগ দেয় তারা জানে এরা দোতলা-তিনতলা পর্যন্ত যাইতে পারবো। তারপরও সুযোগ দেয় কারণ এদের দিয়ে তারা তাদের স্বার্থ হাসিল করতে চায়। এ কারণে তারা ওদেরকে প্যাট্রোনাইজ করে, বিদেশে পাঠায়, ছবি ছাপে, নাম ছাপে, তাদের ওপরে লেখা ছাপে। কিন্তু যারা মাস্টার হইয়া গেছে তাদেরকে তারা মূল্যায়ন করে না। যাইহোক। এখন যে সময় চলতাছে- এসময়ে ঢাকার রাস্তায় দাঁড়াইয়া তুমি যদি একটা ফুঁও দেও তা পৃথিবীর সকল মানুষের কানে গিয়া লাগবে। কাজেই আফসোস কইরা লাভ নাই। আমার দেশে তুমি আমারে পাত্তা দিতাছো না, আমারে শিল্পী বইলা মনে করতাছো না বা মনে করলেও সুযোগ দিতাছো না- অন্য জায়গায় দেবে। মৃত্যুর পর হইলেও দিবে। আমি তো এমন শিল্পী হইতে চাই যে মৃত্যুর পরও বাঁইচা থাকবে। জীবিত অবস্থায় আমি কি করলাম, আমার কয়টা সাক্ষাৎকার ছাপা হইলো, নাম কোথায় কোথায় ছাপা হইলো সেটা দেইখা পুলকিত হওয়ার চেয়ে মৃত্যুর পরও আমি কতদিন বাঁইচা থাকমু সে হিসাব করাটাই আমি সবচেয়ে বেশি বুদ্ধিমানের কাজ বইলা মনে করি। পাঠকরা জানে না, বাংলাদেশের প্রায় সব পত্র-পত্রিকার ভিতরটা হইলো অগণতান্ত্রিক এবং স্বেচ্ছাচারী। যারা মেধাবী ও নিরীহ সাংবাদিক-ফটোসাংবাদিক পত্রিকাগুলো তাদের ওপরে এক ধরণের মানসিক অত্যাচার চালায়। তাদের পদোন্নতি কম হয়, বেতম কম থাকে। যারা সম্পাদকের চামচাগিরি করে, মিথ্যা কথা বলে, দুনম্বরি করে এবং যারা সাংবাদিকতার নামে অবৈধভাবে সম্পদ ও অর্থ উপার্জন করে তাদেরই পদোন্নতি হয়, উন্নতি হয়। আমি এসব নিজের চোখে দেখছি, নাম বলতে চাই না। পাঠকরা যদি জানতো পত্রিকার ভিতরে কি হয়, তথাকথিত দুনম্বর সাংবাদিক ও সম্পাদকরা কি করে তাহলে তারা পত্রিকা পড়া বন্ধ কইরা দিতো।
প্রশ্ন : এমন কোনো স্বপ্ন আছে যা আজো পূরণ হয়নি?
নাসির আলী মামুন : আমি যত স্বপ্ন দেখছি তার প্রায় সবই পূরণ হইছে। কোনো কোনোটা হয়তো সম্পূর্ণ পূরণ হয় নাই, আংশিক হইছে। এখন ‘ফটোজিয়াম’টাকে আমি বাস্তাবে দেইখা যাইতে চাই। আগামী ৩ থেইকা ৪ বছরের মধ্যে আমি এইটা দেখতে চাই। আর আমার কোনো ফটোগ্রাফির ভালো বই নাই, ভালো বই করতে চাই। যাতে তরুণ প্রজন্ম, আগামী প্রজন্ম আমার কাজ দেখতে পারে। আমার যে আসল কাজ এগুলো কেউরে আমি দেখাইতে পারি নাই। বইয়ের কাজ শুরু হইছে, আমি ফটোশপ ও প্রোডাকশনের কাজ করতাছি। আশা করি এক বছর পর আমার একটা ভালো বই বাইর হইবো। তারপর আরো বই বাইর হইবো।
প্রশ্ন : আপনি ঢাকার ছেলে। আগের ঢাকা আর এখনকার ঢাকাকে কেমন করে দেখেন?
নাসির আলী মামুন : আগের ঢাকা আর এখনকার ঢাকার মধ্যে অনেক পার্থক্য। পার্থক্য হওয়াটা স্বাভাবিক। কিন্তু আরো দ্রুত পরিবর্তন হওয়া দরকার ছিল। রাজধানী ঢাকার বয়স ৪শ বছর হইছে। কিন্তু ৪শ বছরে এই শহরের যে পরিবর্তন হওয়ার কথা ছিল তা হয় নাই। প্রধানত দুইটা কারণে হয় নাই- প্রথমত গরীব দেশ, দ্বিতীয়ত পরিকল্পনাহীনতা। সুন্দর-সুস্থ পরিকল্পনা না থাকায় ঢাকা শহরটা ঠিক মতো পাকে নাই, কুঁড়ির মধ্যেই রইয়া গেছে। একটা ফল দীর্ঘদিন কুঁড়িতে থাকলে তখন ওইটার মইধ্যে পোকা ঢোকে। তেমনি ঢাকা শহরে পরিকল্পনা ছাড়া এই যে ঘর-বাড়ি-বিল্ডিং হইছে এগুলো সব পোকা-মাকড়ের মতো। ড্রেনেজ সিস্টেম ভালো না। গুলশান-বনানীতে যাও, দেখবা সুন্দর সুন্দর সব বিল্ডিং। কিন্তু ওই বিল্ডিংয়ের নিচের ড্রেনেজ সিস্টেমের অব্যবস্থাপনা দেইখা তুমি অবাক হইয়া যাইবা। সিটি করপোরেশনের সকল স্ট্রাকচার ঘুণেধরা। পরিকল্পনা অনুযায়ী কিছু হয় নাই বইলা ঢাকা শহর ঠিকমতো বিকশিত হয় নাই। সুস্থভাবে হয় নাই বইলাই অসুস্থ শহর। এই শহরটা দেইখা এখন কষ্ট লাগে, এই শহরে আমি বসবাস করি। একটা অসুস্থ পরিবেশের মধ্যে যদি একজন সুস্থ মানুষ থাকে সেও তো অসুস্থ হইয়া যায়, অন্তত মানসিকভাবে। আমরা এখন যেই শহরে আছি তা পক্ষাঘাতগ্রস্থ, সংক্রামিত রোগীদের শহরের মতো। ঢাকা শহরে থাকাটা নিরাপদ বলে আমি মনে করি না, কেউই করে না। কোথায় যাবো? কোথাও যাওয়ার জায়গা নাই, আমার দেশ, আমার জন্মভূমি। দুঃখ হয় এই কারণে- শহরটাকে সুন্দর করতে আমরা পারতাম। আমরাই শহরটারে নষ্ট করছি। সরকার নষ্ট করছে, যারা এই শহরের নাগরিক তারাও নষ্ট করছে। নিঃশ্বাস নিতে আমি মূল ঢাকা থেইকা দূরে থাকি। কিন্তু কাজ যখন করি তখন অসুস্থ জায়গায় গিয়াই করতে হয়।
প্রশ্ন : ফটোগ্রাফার মানে যেন শুধু ছবি তোলা। কিন্তু আপনি ছবি তোলার পাশাপাশি কলম চালানো শুরু করলেন। লেখালেখির শুরুটা কিভাবে হলো?
নাসির আলী মামুন : আমার প্রথম লেখা ছাপা হইছিল পল্লীকবি জসীম উদ্দীন মারা যাওয়ার পরপরই। ১৯৭৬ সালে লেখাটা ছাপা হইছিল শাহাদত চৌধুরী সম্পাদিত সাপ্তাহিক বিচিত্রায়। জসীমউদ্দীন মারা গেলেন ১৪ই মার্চ আর লেখাটা ছাপা হইলো এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহের সংখ্যায়। ওই সংখ্যায় জসীম উদ্দীনকে নিয়া ৩টা লেখা ছাপা হয়। দিলারা হাশেমের একটা, আরেকটা কবি অসীম সাহার, আরেকটা লেখা আমার। সাথে আমার তোলা জসীম উদ্দীনের ছবিও ছাপা হইছিলো। আমার নাম তো নাসির আলী মামুন। শাহাদত ভাই বললেন, “না এটি ছদ্মনাম।” উনি একজন আধুনিক লোক, মুক্তিযোদ্ধা। বাংলাদেশে আধুনিক ম্যাগাজিনের প্রবর্তক। কিন্তু তারপরও উনি আমার নামটা মাইনা নিতে পারলেন না। জিজ্ঞাসা করলেন, “আসল না কি?” বললাম, “নাসির আলী খান। কিন্তু নাসির আলী মামুন নামেই ফটোগ্রাফি করি, এই নামই রাখেন।” বললেন, “না-না, এই নাম হইতে পারে না।” উনার মতো লোক আমার অনিচ্ছা সত্ত্বেও নাসির আলী খান দিয়াই লেখাটি ছাপলেন। আর ছবি ছাপছে তাতে আমার নাম দেয় নাই। তার অনেক পরে সচিত্র সন্ধানী পত্রিকার দায়িত্বে থাকা গল্পকার সুশান্ত মজুমদার বললেন, আপনার এতো অভিজ্ঞতা , সেগুলো নিয়া লেখন না। আমি বললাম, আমি তো লিখতে পারি না। তিনি বললেন, এই যে আমাদের সাথে যেভাবে কথা বলেন সেভাবেই লেখেন। ওই পত্রিকার প্রত্যেক সংখ্যায় ‘ছবির কথা’ নামে লেখা শুরু করলাম। ৩ পৃষ্ঠা, ৪ পৃষ্ঠা কইরা ছবিসহ লিখতাম। এভাবে লিখছি প্রায় বছর দেড়েক। তারপর ’৮৮ সালে আমেরিকায় চইলা গেলাম। ওখানে সাপ্তাহিক বাঙালী নামে ট্যাবলয়েড আকারের একটা পত্রিকা আছে। সেইটার সম্পাদক কৌশিক আহমেদ বলল, আপনি লেখেন। কৌশিকের কাগজে আমি এক বছরের বেশি সময় লিখছি। ছবি থাকতো, সেই ছবির পেছনের কথা লিখতাম। ঢাকায় যখন ফিরা আসলাম তখন আবু হাসান শাহরিয়ার আমাকে লিখতে উৎসাহ দিলো। সে তখন মুক্তকণ্ঠ-এর সাহিত্য সম্পাদক। ৪ পৃষ্ঠার কালারফুল সাময়িকী। নতুন নতুন লেখা, নতুন লেখদের লেখা, প্রবীণদের লেখা...ভীষণ সুন্দর। আমাকে সে প্রথম উৎসাহ দিলো। লেখার জন্য এতো জায়গা বাংলাদেশের আর কোনো সম্পাদক দেয় নাই। দিতেও পারবো না। মানে নিকট ভবিষ্যতে এই দেশে কোনো নতুন লেখকের জন্য এমন কোনো সাহিত্য সম্পাদক নাই যে এতো জায়গা দিতে পারবে। একটা দৈনিকের দেড় পৃষ্ঠা, পৌনে দুই পৃষ্ঠা সে আমাকে দিতো। কোনো সম্পাদকের পক্ষে এই কাজ সম্ভব না। এতো উদারমনা সাহিত্য সম্পাদক বাংলাদেশে একজনও নাই। নিকট ভবিষ্যতেও আর হবে না। অদূর ভবিষ্যতে যদি হয়, তোমরা যদি করো।
প্রশ্ন : আপনি তো বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ দেখেছেন। সেসময়েয় কথা কিছু বলবেন?
নাসির আলী মামুন : একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় আমার অল্প বয়স। ঢাকা কলেজে পড়তাম। আমার বড় ভাই ছিল মুক্তিযোদ্ধা। যুদ্ধের অনেক পরে উনি মারা যান। রেশাদ তারই ছেলে। বড় ভাইয়ের কারণে অনেক মুক্তিযোদ্ধা আমাদের বাসায় আসতো, রাত্রে থাকতো। অনেক সময় তারা আগ্নেয়াস্ত্র রাইখা যাইতো। বাজারের ব্যাগে কইরা সেগুলো নিয়া আসতো। ব্যাগের উপরে থাকতো শাক-সবজি, ভিতরে থাকতো এসএমজি, বারুদ, ডেটোনেটর, গ্রেনেড ইত্যাদি। যারা আসতেন তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন সেসময়ের ঢাকা সিটির কমান্ডার মুক্তিযোদ্ধা আবদুল আজিজ ভাই। পরে মারা গেছেন। বড় ভাইয়ের আরো অনেক মুক্তিযোদ্ধা বন্ধুরা আসতো। তারা এমন এমন সময় অস্ত্রভর্তি ব্যাগ নিয়া বাড়িতে আসতো যে আশেপাশের লোকরা সন্দেহ করতো। বিকেলে তো কেউ বাজার করে না, তারা বিকেলেও আসতো। আমরা তখন থাকতাম কাঁঠাল বাগানের কাছে, আল-আমিন রোডে। আমাদের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এক বিহারী পরিবার ছিল। তাদের সাথে দীর্ঘদিন গ্রিন রোড ছিলাম। একদিন ওরাই আমাদের ধরাইয়া দিলো। অক্টোবর মাসের ঘটনা। রাত আড়াইটার দিকে পাকিস্তানি বাহিনী আমাদের বাড়ি ঘেরাও করলো। আল্লাহর রহমত- দুইদন আগে আমার বড় ভাই এবং তার বন্ধুরা বাসা থেইকা চইলা গেছিল। অস্ত্র কিন্তু তখনো ছিল। বাসাটার নিচে দেয়াল, উপরের টিন ও হার্ডবোর্ডের পিছনে অস্ত্র ছিল। বাসা তন্নতন্ন কইরা খুঁইজাও ওরা অস্ত্র পাইলো না। সিলিংয়ের নিচে হাত দেয় নাই, দিলেই ধরা পইড়া যাইতাম। তারপরও পাকিস্তানি বাহিনী আমাকে, আব্বাকে, বাড়িওয়ালার ছেলে এবং অন্যান্য তরুণ ভাড়াটিয়াদের ধইরা নিয়া গেলো। তাদের হাতে ১৫ দিন আটক ছিলাম। পূর্ব পাকিস্তানের সামরিক আইন প্রশাসকের কার্যালয় ছিল, যেটা পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক পরিষদ ভবন ছিল ওইটার পাশে অনেকগুলা এমপিও হোস্টেল ছিল- সেগুলা হইয়া গেল কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প। বাথরুম ও পাকঘরের মধ্যে ৮-১০জন কইরা আসামী রাখতো। খাইতে দিতো না, অত্যাচার করতো। ওইসব জায়গা থেইকা আসছি তো আমি। গত কয়েক বছর যাবৎ দেখতাছি যে জেলায় জেলায় ভাষা সৈনিক বাইর হইয়া গেছে। দেখলাম সাংবাদিকরা ছবিসহ সেসব নিউজ ছাপতাছে। বয়স কত? ৭৫-৭৮। কিভাবে সম্ভব? ভাষা আন্দোলনের সময় তার কত বয়স ছিল? কিভাবে সে ভাষা সৈনিক হয়? এমন মুক্তিযোদ্ধাও দেখি বাইর হইছে। কি করছে? মুক্তিযোদ্ধাদের ডাব খাওয়াইছিল, মুক্তিযোদ্ধাদের নৌকা দিয়া পার কইরা দিছে একবার, অনেকে তো কিছুই করে নাই। যে কেউ নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা দাবি করতাছে। আমরা এমন দাবি করি না। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ছিলাম, মুক্তিযুদ্ধ চাইতাম, পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে ধরাও পড়ছিলাম, মাইরও খাইছি- এই আরকি। সরাসরি মুক্তিযুদ্ধ করি নাই।
প্রশ্ন : স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশ কতটা এগিয়েছে বলে আপনি মনে করেন?
নাসির আলী মামুন : মুক্তিযুদ্ধের পরে, ১৬ ডিসেম্বরের পরের দিন বাংলাদেশ যে জায়গায় ছিল এক অর্থে এখনো ঠিক সেই জায়গায় দাঁড়াইয়া আছে। আর আরেকদিক দিয়া দেখলে, অনেক দূর আগাইয়া গেছে। মনে করো, আমার ছেলে বিদেশে থাকে, আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন ইঞ্জিনিয়ার। নাসায় চাকরি করে। আর আমার বাবা কিচ্ছু করতে পারে না- মৃত্যুপথযাত্রী। ওই মৃত্যুপথযাত্রী রোগীর মতো আমাদের প্রশাসন, রাজনীতি, রাজনীতিবিদ এবং উন্নয়ন এক জায়গায় দাঁড়াইয়া আছে। আর অন্যান্য দিকে বিকশিত হইছে- শিল্পকলায় হইছে, সাহিত্যে হইছে। ওদিকে মুক্তিযুদ্ধের পরে আমাদের সবচেয়ে বড় অর্জন নিয়ে আসছেন প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস। আরো নানা দিকে বাংলাদেশ আগাইতাছে। আগাইলে কি হবে? আগেই তো বললাম, রাজনীতি হইলো এই যুগের নিয়তি। তোমার ভাগ্য যদি তোমার পক্ষে না যায় তাহলে তো তুমি আগাইতে পারবা না । তোমার পুরা বাড়িতে সবাই যদি সুখে-শান্তিতে থাকে, একটা সুন্দর অবস্থায় থাকে, তাহলে না তোমার হ্যাপি ফ্যামিলি। আর তোমার বাড়িতে তুমি একা ভালো আছো, আর সবাই অসুস্থ, কারো ক্যান্সার, কেউ মৃত্যুপথযাত্রী, কেউ মাদকাসক্ত- তার মানে তুমি শান্তিতে নাই। পুরা বাংলাদেশের ওই অবস্থা। অস্থির রাজনীতি থেইকা যদি আমরা বাইর হইতে না পারি তাহলে এই অবস্থা চলতে থাকবে। দেশের উন্নয়ন করবে কে? দেশের উন্নয়নে দেশের প্রত্যেকটা লোক সহযোগিতা করবে, অংশগ্রহণ করবে, বাধা দেবে না। কিন্তু উন্নয়নটা করবে তারা যারা দেশ চালায়, রাজনীতি করে। প্রধানমন্ত্রী থেইকা শুরু কইরা প্রত্যেকটা মন্ত্রণালয়। তারা কি পারতাছে? পারতাছে না। ৪০ বছরে তারা যে প্রক্রিয়ায় লণ্ঠন ও হত্যাকা- চালাইতাছে, রাজনীতিকে অস্থির কইরা তুলছে সে প্রক্রিয়ায় এমন একটা দরিদ্র দেশের কি থাকে? থাকে কিছু? ‘বটমলেস বাস্কেট’ তো এমনিতেই হইয়া গেছে দেশটা। এইটা তো হেনরি কিসিঞ্জারের বলার দরকার হয় না। এই দেশটার কি হবে? যে দেশের টাকা-পয়সা কিচ্ছু নাই সে দেশে বড় কোনো স্বপ্ন দেখা সম্ভব না। সে দেশে বড় কোনো মেধাবী মানুষের জন্ম হবে না। ওই একজন হইয়া গেছে প্রফেসর ইউনূস। কই দেখাও তার মতো, রবীন্দ্রনাথের মতো, গান্ধীর মতো কোনো লোক আছে কিনা। শিল্প-সাহিত্য-রাজনীতি-অর্থনীতি-বিজ্ঞান কোথাও নাই।
প্রশ্ন : আলোকচিত্রশিল্পী নাসির আলী মামুনকে কিভাবে মূল্যায়ন করেন?
নাসির আলী মামুন : আমি বাংলাদেশের জীবিত অথবা মৃত সকল ফটোগ্রাফারের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদ। আমি সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র, একাকী এবং নিঃসঙ্গ। আমার কোনো বন্ধু নাই। খুব মেধাবী মানুষের কোনো বন্ধু হয় না। কিন্তু মারা যাওয়ার পর তাদের অনেক বন্ধু আসে। আমি মনে করি আমি সেই গোত্রের লোক। যেই গোত্রের মানুষের বন্ধু থাকে না কিন্তু শত্রু অনেক থাকে। আমি গত ৪০ বছরে আমার আশোপাশে দেখছি সব কুমির, সাপ হাঁ কইরা দাঁড়াইয়া আছে। এদের মধ্য দিয়াই আমি ৪০ বছর ধরে প্রবাহিত হইয়া আসছি। ৫টা প্রজন্ম আমার ক্যামেরায় ধরা পড়ছে। বাংলাদেশের মিডিয়াসহ শিল্প-সংস্কৃতি জগত যারা নিয়ন্ত্রণ করে তাদের পার কইরা আমি এতোদূর আসছি। এখনো চলতাছি। এরা হাঁ কইরা তাকাইয়া আছে, কেউ খামচি দিতাছে, কেউ গুলি করতাছে, কেউ মারতাছে...মাইর খাইতে খাইতে এই পর্যন্ত আসছি। এখন আর আমার মৃত্যু নাই।
প্রশ্ন : এই প্রজন্মের ফটোগ্রাফারদের উদ্দেশ্যে কোনো পরামর্শ?
নাসির আলী মামুন : নতুন প্রজন্মের ফটোগ্রাফারদের প্রতি আমার পরামর্শ হইলো- কারো পরামর্শ শুনবেন না।
প্রশ্ন : অবসর সময়ে কি করেন মামুন ভাই?
নাসির আলী মামুন : আমার কোনো অবসর নাই। তুমি আসার আগে আমি কম্পিউটারে কাজ করতেছিলাম। অনেক রাত পর্যন্ত কাজ করছি। আমি এখন ষাট বছরে পড়ছি। চিরদিন তো বাঁইচা থাকবো না। কাজই করতে পারবো আর হয়তো সর্বোচ্চ ১০ বছর। আমি জীবনে যত কাজ করছি নিজের প্রয়োজনে, দেশের প্রয়োজনে সেগুলাকে ক্যাটালগিং করতাছি। ক্যাপশন লেখা, তারিখ দেয়া ইত্যাদি কাজ করতাছি। ৮-১০ বছর লাগবো শেষ করতে। আমি বিদেশে যেহেতু ছিলাম সব ধরণের রান্না করতে হইছে, এখনো করতে পারি। অনেক আন্দজি রান্নাও করছি, ব্যাকরণের মধ্যে পড়ে না আরকি। যেমনÑ ভাজি করছি, তাতে আলু দিছি, ফুলকপি দিছি, সবুজ আপেলও দিছি। অনেকে কইছে, ধুর! এগুলো তরকারি হিসেবে খাওয়া যায় না। কিন্তু যারা খাইছে তারা পুরা খাইছে। আর বই পড়ি। বই না পড়লে বুঝবো কিভাবে হুমায়ূন আহমেদ বত বড় লেখক? আখতারুজ্জামান ইলিয়াস কত বড় লেখক ছিল? জসীম উদ্দীনের লেখার স্টাইল এখনো আদরণীয় কেন?- না পড়লে জানমু কেমনে? তোমাদের মতো হয়তো ওতো পড়ি না, কিন্তু অবশ্যই পড়ি। না পড়লে কিভাবে মানুষ চিনবো?
প্রশ্ন : মামুন ভাই, আপনি কি মনে করেন এই জাতি আপনার যথার্থ মূল্যায়ন করেছে?
নাসির আলী মামুন : আমি বলব না এই জাতি আমাকে মূল্যায়ন করে নাই। কারণ জাতি বললে পুরা ১৬ কোটি লোক বুঝায়। এই ১৬ কোটি লোক কি সচেতন? ১৬ কোটি লোক কি রাত্রে ঘুমাইতে পারে? সবাই কি ভাত খাইতে পারে? ১৬ কোটি মানুষের ঘরে যে ছেলে-মেয়ে আছে, যাদের বয়স ৫ থেইকা ১০ বছর- তারা কি স্কুলে যাইতে পারে? পারে না। কাজেই জাতি বললে অনেক বড় কিছু বুঝায়। এই জাতির মধ্যে সুবিধাভোগী শ্রেণী, স্বার্থান্বেষী শ্রেণী, তথাকথিক শিক্ষিত ও ব্যবসায়ী শ্রেণী এবং মিডিয়া আমাকে মূল্যায়ন করে নাই। তারা আমারে চিনে না। পত্রিকাগুলা আমারে ভয় পায়, আমার কাজরে ভয় পায়। আমি বিকশিত হই তা তারা দেখতে চায় না। আমি যাতে বিকশিত হইতে না পারি সেজন্য হয়তো বাধা দেয় না, কিন্তু সাহায্যও করে না। একটা অদৃশ্য দেয়াল আমার চারদিকে তৈরি করা আছে। তারা আমারে এই দেয়ালে বন্দি দেখতে চায়। কারণ আমি মনে করি যে আমাকে দিয়া অনেক কাজ করাইয়া নিতে পারতো প্রিন্ট মিডিয়া ও প্রকাশনা জগত। সেই কাজ করাইয়া নেয়ার জন্য কেউ আগাইয়া আসে নাই। আমার কাজের মূল্যায়নও তারা করে না। আমার বন্ধু-বান্ধব-পরিচিতরাই শিল্প-সাহিত্যবিষয়ক পত্রিকায় আছে। যে পত্রিকা শিল্পী-লেখকদের সম্মান দেয়, সাক্ষাৎকার নেয়, তাদের সম্পর্কে মূল্যায়নধর্মী লেখা ছাপে। বেশিরভাগ পত্রিকাই আগাইয়া আসে না। ওই প্রদর্শনী হলে নিউজ হয়, ফিচার হইলে হয় না হইলে হয় না। তবে সম্মান দিলে আমাকে দ্য ডেইলি স্টার পত্রিকাই দেয়। পত্রিকাটির ১৫তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে আমার তোলা ছবি এবং আমাকে নিয়া লেখা দিয়া ৫ পৃষ্ঠা ফিচার করছিল। যে ছেলেটা এই কাজটা করছে তার সাথে কোনোদিনও আমার যোগাযোগ ছিল না। ফোনে ফোনে কথা হইছে। আর যারা আমার কাছের তারা আসলে বন্ধুর বেশে, সহকর্মীর বেশে হাঁ কইরা রইছে, অপেক্ষা করতাছে- কখন তাদের মুখের ভিতর দিয়া ঢুইকা আমি তাদের পেটের মধ্যে চইলা যাই। আমার টাকা-পয়সা নাই, গ্রামের মধ্যে থাকি, ঢাকায় কোনো ফ্যাট নাই- কিন্তু আমার যা আছে বাংলাদেশে আর কারো কাছে তা নাই। যে হীরা, মণি-মুক্তা এবং সোনার টুকরা নিয়া আমি বইসা আছি সেগুলা কারো কাছে নাই। আমারে আর্থিক মূল্যায়ন ও সহযোগিতা করলে কি হইতো? আমি হয়তো আরো বেশি মানসিক আনন্দ পাইতাম, আরো বেশি কাজ করতে পারতাম। আমারে তো কেউ আটকাইতে পারে নাই। একটা প্রবাদ আছে- ‘হাতি চালে বাজার কুত্তা ভোকে হাজার।’ হাতি হাতির মতো বাজার দিয়া হাঁইটা যাইতাছে, কুকুর চিল্লানের চিল্লাইতাছে। আর সরকার থাকে তোপখানা রোডের সচিবালয়ে। তারে দেখাও যায় না, ধরাও যায় না। সরকার আমারও ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। সরকারি কোনো পুরস্কার বা পৃষ্ঠপোষকতার জন্য আমি কোনো আবেদনও করি নাই, প্রত্যাশাও করি না। সরকার যদি আমারে চিনতো তেইলে তো অনেক আগেই অন্তত দুএকটা অনুষ্ঠানে ডাকতো। কোনো বড় সরকারি অনুষ্ঠানে আমি আমন্ত্রিত হই না। সরকারি কোনো লোকজনের সাথে আমার কোনো যোগাযোগ নাই। কোনো সরকার আমাকে মূল্যায়ন করে না কারণ কোনো সরকারি-বেসরকারি রাজনৈতিক দলের সাথে আমি নাই, থাকবোও না। কারো প্রতি আমার কোনো সমর্থনও নাই, কোনো দলের প্রতি সরাসরি সমর্থন নাই। রাজনীতি যদিও এই যুগের নিয়তি, তারপরও আমি সরাসরি রাজনীতি করি না। আর কোনো নেতা-নেত্রীর সাথে আমি বৈঠকও করি না, মিশিও না-কাজেই এমন একটা জায়গায় আমি অবস্থান করি যে অবস্থার মানুষকে পাত্তা না দিলেও নেতা-নেত্রীদের কিছু যায় আসে না। কারণ আমি তো তাদের ঘরানার মধ্যে পড়ি না। সরকার তো শুধু শেখ হাসিনা, খালেদা জিয়া না। তারা তো আমাকে বলবে না, “আপনি কি নাসির আলী মামুন? আপনার একটা করা একটা পোরট্রেট নিয়া আসেন, আমরা কিনা নেবো।” এই কাজ করবে শিল্পীদের জন্য যেসব সরকারি প্রতিষ্ঠান বানানো হইছে তারা। যেমন- শিল্পকলা একাডেমী, জাতীয় জাদুঘর, বাংলা একাডেমী। এদেরই তো আগায়া আসা উচিত। তারা এও বলতে পারে, প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেইকা আপনি এই শিল্পীদের ছবি তুলে দেন। বাংলা একাডেমী বর্ধমান হাউসে লেখক মিউজিয়াম করছে। কই একবারও তো বললো না যে, আপনি যে গত ৪০ বছনে লেখকদের ছবি তুলতে তুলতে হয়রান হইয়া গেছেন, অনেক টাকা খরচ করছেন, দেন আপনার ছবিগুলা। ছবিগুলা নিলে তো আমি আর্থিকভাবে লাভবান হইতাম। তবে আমি অবশ্যই বাংলা একাডেমীর কাছে কৃতজ্ঞ- তারা ৬ বার আমার একক প্রদর্শনীর আয়োজন করছে।
প্রশ্ন : মামুন ভাই, আজ তাহলে শেষ করি? আর কিছু বলতে চান?
নাসির আলী মামুন : শেষে শুধু এটুকু বলতে চাই, আমি এতোদিন যা করছি নিজে নিজে করছি। কেউ আইসা একটা লজেঞ্জ আমারে দেয় নাই। আমি যতদূর আসছি পুরাটাই নিজের চেষ্টায়, নিজের শক্তিতে, নিজের জ্ঞানে আসছি। আমাকে কেউ বিকশিত হওয়ার জন্য তুইলা ধরে নাই। উল্টা দাবানোর জন্য নানা রকম চেষ্টা করছে।
আমাকে সময় দেয়ার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ মামুন ভাই।
নাসির আলী মামুন : তুমি কষ্ট কইরা আমার কাছে আসছো, কথা বলছো তাই তোমাকেও ধন্যবাদ। ভালো থাকো।
প্রকাশকাল : ২৬ অক্টোবর ২০১২, সাপ্তাহিক ২০০০, ঈদুল আজহা সংখ্যা ২০১২
সাক্ষাৎকার গ্রহণের তারিখ: ১৯ জুলাই, ২০১২
[*মূল সাক্ষাৎকারের কিছু অংশ]
No comments:
Post a Comment