Monday, March 10, 2014

ফটোগ্রাফি ॥ পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রচার

এই মুহূর্তে বাংলাদেশের ফটোগ্রাফির উন্নয়নে দুটি জিনিস অত্যন্ত জরুরি। সরকারি ও বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা এবং প্রচার। চারুকলার সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যমের অন্যতম ফটোগ্রাফি। ফটোগ্রাফি থেকে আমাদের অর্জনের কমতি নেই। আমাদের আলোকচিত্রীরা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের মুখ উজ্জ্বল করছেন। ফটোগ্রাফির হাত ধরে বাংলাদেশে যত পুরস্কার ও অর্থ এসেছে চারুকলার অন্যান্য সকল বিভাগ মিলেও এতো পুরস্কার ও অর্থ আনতে পারেনি। কিন্তু তারপরও আমাদের দেশে ফটোগ্রাফি বিমাতাসুলভ আচরণের শিকার


















সুদীপ্ত সালাম

এই মুহূর্তে বাংলাদেশের ফটোগ্রাফির উন্নয়নে দুটি জিনিস অত্যন্ত জরুরি। সরকারি ও বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা এবং প্রচার। চারুকলার সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যমের অন্যতম ফটোগ্রাফি। ফটোগ্রাফি থেকে আমাদের অর্জনের কমতি নেই। আমাদের আলোকচিত্রীরা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের মুখ উজ্জ্বল করছেন। ফটোগ্রাফির হাত ধরে বাংলাদেশে যত পুরস্কার ও অর্থ এসেছে চারুকলার অন্যান্য সকল বিভাগ মিলেও এতো পুরস্কার ও অর্থ আনতে পারেনি। কিন্তু তারপরও আমাদের দেশে ফটোগ্রাফি বিমাতাসুলভ আচরণের শিকার। ফটোগ্রাফির সামগ্রিক উন্নয়নে যে পদক্ষেপগুলো নিতে হয়- যেমন প্রদর্শনীর আয়োজন, মেধাবী আলোকচিত্রীদের তুলে ধরা, আলোকচিত্রীদের পুরস্কৃত করা ইত্যাদি, সেগুলোর জন্য বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, পৃষ্ঠপোষকরা এগিয়ে আসে না। এগিয়ে আসলেও উদারতার পরিচয় দিতে পারে না। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীসহ সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো ফটোগ্রাফি বিষয়ে চূড়ান্ত উন্নাসিকতার পরিচয় দিয়েছে। তাই সরকারের কাছ থেকে আশা করে লাভ নেই।
আমার ধারণা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো ফটোগ্রাফিকে তাদের সিএসআর (করপোরেট সোস্যাল রেসপনসিবিলিটি)-এর তালিকার বাইরে রাখে। মানে ফটোগ্রাফিতে পৃষ্ঠপোষকতা দিলে যেন সমাজের প্রতি দায়িত্ব পালন করা হয় না। টিভিতে রিয়ালিটি শো, অডিও-ভিডিও সিডি প্রকাশ- সর্বোপরি লোক দেখানো কাজ করলে যথাযথভাবে দায়টা পূরণ করা যায়। এজন্যই বুঝি পৃষ্ঠপোষকরা ফটোগ্রাফি নিয়ে ভালো কোনো উদ্যোগের পৃষ্ঠপোষক হতে নিরুৎসাহী। ফটোগ্রাফির প্রভাব, শক্তি ও আন্তর্জাতিক অবস্থান পৃষ্ঠপোষক প্রতিষ্ঠানগুলোর অজানা নয়। তারপরও কেন এই আচরণ? আমি এর কারণ খোঁজার চেষ্টা করেছি। আসলে তারা যে শুধু সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে এধরনের সাংস্কৃতিক উদ্যোগের সাথে থাকে তা নয়। তারা কিছু বাণিজ্যিক লাভও আশা করে। ফটোগ্রাফির প্রতি স্থানীয় গনমাধ্যমের অনাগ্রহ রয়েছে এতে কোনো সন্দেহ নেই। প্রচারেই প্রসার, বাংলাদেশে ফটোগ্রাফির প্রচার নেই, তাই এর প্রসারও নেই। একটি অডিও অ্যালবামের সিডির মোড়ক উন্মোচন হলে বিনোদন সাংবাদিকরা ঝাঁপিয়ে পড়ে, কিন্তু একটি আলোকচিত্র প্রদর্শনী হলে সাংবাদিক খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। ছোট বড় সকল সংবাদমাধ্যমের বেলায় এই কথাটি প্রযোজ্য। বরং বড় সংবাদমাধ্যমের তুলনায় ছোট সংবাদমাধ্যম ফটোগ্রাফি-সংক্রান্ত খবর বেশি প্রকাশ করে। কিন্তু মোদ্দাকথা, সংবাদমাধ্যমে ফটোগ্রাফির খবর অবহেলিত। একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান যখন একটি সাংস্কৃতিক উদ্যোগে পৃষ্ঠপোষকতা দেয় তখন তারা আশা করতেই পারে যে এই খবরটি ফলাও করে প্রচার হবে। এই প্রচারণাই ওই প্রতিষ্ঠানের লাভ। ফটোগ্রাফি যেহেতু মিডিয়ার চোখে গুরুত্বহীন সেহেতু তার প্রচারণা যথাযথভাবে হয় না। সুতরাং পৃষ্ঠপোষকরাও ফটোগ্রাফি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়।
ফটোগ্রাফিবিষয়ক উদ্যোগের খবর কিছু কিছু ছাপা হয়, টিভিতে প্রচারিত হয়। সেগুলোর বেশিরভাগই খবর হিসেবে প্রকাশিত হয় না। সংবাদকর্মীরা এধরনের বেশিরভাগ খবর ‘ঢেঁকি গেলা’র মতো করে গেলেন। অনুরোধের ঢেঁকি। সংবাদমাধ্যমের কাছে ফটোগ্রাফি এতোটাই অচ্ছুত যে অনুরোধ করা ছাড়া ফটোগ্রাফির খবর জাতে উঠে না। যে গুটিকয়েক মিডিয়া  ফটোগ্রাফি-সংক্রান্ত খবরকে খবর হিসেবেই বিবেচনা করে এবং প্রকাশ করে একজন আলোকচিত্রী হিসেবে তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। সংবাদমাধ্যমের অন্যতম স্তম্ভ ফটোগ্রাফি। তারপরও ফটোগ্রাফির প্রতি সংবাদমাধ্যমের অনিহার কারণ কি? কারণ দুটি, সংবাদমাধ্যমের ভেতরের ও বাইরের আলোকচিত্রীরা আলোকচিত্রকলাকে মর্যাদাপূর্ণ ও বুদ্ধিবৃত্তিক স্থানে নিয়ে যেতে পারেননি। ফলে ফটোগ্রাফি ও ফটোগ্রাফারদের প্রতি সংবাদমাধ্যমের দৃষ্টিভঙ্গি নেতিবাচক। অন্য কারণটি হলো, ফটোগ্রাফির বিশ্বব্যাপী প্রসার ও ক্ষমতা সম্পর্কে স্থানীয় সংবাদকর্মীদের সীমিত জ্ঞান। তবে স্বীকার করতেই হবে ধীরে ধীরে এই চিত্র বদলাচ্ছে। বিদেশী প্রকাশনী আমাদের আলোকচিত্রীদের বই বের করছে, বাইরের জাদুঘর ও গ্যালারিতে তাদের ছবির প্রদর্শনী হচ্ছে, তারা বড় বড় আন্তর্জাতিক পুরস্কার পাচ্ছেন, এসব খবর কতদিন এড়িয়ে যাওয়া যায়!
বাংলাদেশের আলোকচিত্রকলাকে তুলে না ধরার কারণে বাংলাদেশই ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। আমাদের আলোকচিত্রীরা দেশের বাইরে তাদের ছবি তুলে ধরছেন, বিদেশী এজেন্সির হয়ে কাজ করছেন এবং বিদেশীদের চাহিদাই পূরণ করে যাচ্ছেন। বাংলাদেশের ফটোগ্রাফির সার্বিক উন্নতি হলে আমাদের মেধাবী আলোকচিত্রীরা দেশেই নিজের ক্যারিয়ার গড়তে পারতেন, নিজের সবটুকু সৃজনশীলতা ও মেধাকে দেশের জন্যই কাজে লাগাতে পারতেন।
পৃষ্ঠপোষক ও গণমাধ্যম যদি মনে করে ফটোগ্রাফির প্রতি মানুষের অগ্রহ কম তাহলে তারা ভুল করছে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে ফটোগ্রাফির মতো ব্যয়বহুল ক্ষেত্রে মানুষের ব্যাপক আগ্রহ আমার মতো অনেককেই অবাক করে। পহেলা বৈশাখ, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, বিজয় দিবস, হোলি ইত্যাদি বিশেষ দিনে রাস্তায় বের হলে সহজেই অনুমান করা যায় তরুণ প্রজন্মের কাছে ফটোগ্রাফি কতটা জনপ্রিয়। এই জনপ্রিয়তা ও আগ্রহকে কাজে লাগাতে পারলে গোটা জাতি লাভবান হবে। পৃষ্ঠপোষকতা এবং সংবাদমাধ্যমের একটু সহযোগিতা ফটোগ্রাফির জনপ্রিয়তা ও আগ্রহকে উসকে দিতে পারে।  

প্রকাশকাল : ২১ জুন ২০১৪ : বাংলাদেশ ফটোগ্রাফিক এসোসিয়েশনের ২৯তম বার্ষিক সাধারণ সভা উপলক্ষ্যে প্রকাশিত স্যুভেনিয়ার

No comments:

Post a Comment